মোহাম্মদপুরের পরিচিত ৭ হালিমের স্বাদ নিয়েছেন?
ঢাকার খাবারের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছু এলাকা বারবার সামনে চলে আসে। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি, ধানমন্ডির ক্যাফে কিংবা বনানীর ফিউশন রেস্তোরাঁ—সবকিছুরই আলাদা পরিচয় আছে। কিন্তু হালিমের কথা উঠলে অনেক খাবারপ্রেমীর মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে একটি এলাকার নাম—মোহাম্মদপুর।
বিশেষ করে রমজান মাসে এই এলাকার রাস্তা-ঘাট যেন অন্য রকম হয়ে ওঠে। বিকেলের দিকে হাঁটলে দেখা যায় বড় বড় ডেগে হালিম, পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ অপেক্ষা করছে নেওয়ার জন্য।
মোহাম্মদপুরের হালিমের বিশেষত্ব হলো—এখানে একই এলাকায় কয়েকটি ছোট দোকান থাকলেও প্রতিটির স্বাদ আলাদা। অনেক দোকানের মালিককে মানুষ স্নেহ করে ‘মামা’ বলে ডাকে। বছরের পর বছর ধরে তারা নিজেদের হাতের রান্না দিয়ে তৈরি করেছেন এক ধরনের স্থানীয় খাদ্যঐতিহ্য।
চলুন দেখে নেওয়া যাক মোহাম্মদপুরের সেরকম কয়েকটি জনপ্রিয় হালিমের দোকান।
রেজাউল শাহী হালিম
মোহাম্মদপুরের হালিমের আলোচনায় অনেকেই প্রথমেই যে নামটি বলেন, সেটি হলো রেজাউলের হালিম। এটি পাওয়া যায় কাঁটাসুর এলাকায়, রহিম ব্যাপারীর ঘাটের কাছে।
এই হালিমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঘন ডাল এবং কড়া মসলার ব্যবহার। প্রথম চামচেই বোঝা যায়, এখানে মসলার স্বাদ বেশ শক্তিশালী। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বাদটি ভারসাম্যপূর্ণ।
মাংসও সাধারণত বেশ নরম ও ভালোভাবে রান্না করা থাকে। ফলে ডাল ও মাংসের মিশ্রণে একটি গভীর স্বাদ তৈরি হয়।
স্থানীয়দের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে রমজানের সময় বিকেলের দিকে এখানে তুমুল ভিড় দেখা যায়। অনেকেই দূর থেকে এসে শুধু এই হালিমের জন্যই কাঁটাসুরে ঢুঁ মারেন।
আনোয়ার মামার শাহী হালিম
মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে আরেক পরিচিত নাম আনোয়ার মামার শাহী হালিম। এটি অবস্থিত সেলিম কাবাব–এর শিক কাবাব বিক্রির শাখার পাশেই।
আনোয়ার মামার হালিমের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো এর ঘন ও মোলায়েম টেক্সচার। ডাল, গম ও মাংস এত সুন্দরভাবে মিশে থাকে যে পুরোটা এক ধরনের ক্রিমি অনুভূতি তৈরি করে।
এখানে ব্যবহৃত মসলার স্বাদও বেশ আলাদা। সাধারণ হালিমের মতো শুধু ঝাল নয়; বরং এতে একটি স্তরযুক্ত স্বাদ পাওয়া যায়—প্রথমে ডালের মোলায়েমতা, তারপর ধীরে ধীরে মসলার গভীরতা।
এই কারণেই অনেক খাবারপ্রেমী আনোয়ার মামার হালিমকে মোহাম্মদপুরের অন্যতম স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ হালিম বলে মনে করেন।
মনা মামার হালিম
সলিমুল্লাহ রোডে আনোয়ার মামার দোকান থেকে সেলিম কাবাব হয়ে একটু সামনে এগোলেই পাওয়া যায় মনা মামার হালিম।
এই হালিমের ভক্তরা বলেন, এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ডালের স্বাদ। ডাল এমনভাবে রান্না করা হয় যে তা খুব বেশি ভারী নয়, আবার পাতলাও নয়।
ফলে খেতে গেলে এক ধরনের মোলায়েম স্বাদ পাওয়া যায়। মসলাও এখানে পরিমিত। যারা খুব বেশি কড়া বা ভারী হালিম পছন্দ করেন না, তাদের কাছে এই হালিমটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
রমজান মাসে বিকেলের দিকে এখানে প্রায়ই লম্বা লাইন দেখা যায়। অনেকেই পরিবারের জন্য একসঙ্গে কয়েক বাটি করে নিয়ে যান।
আব্দুল কাদের মামার হালিম
মোহাম্মদপুরের টাউন হল মোড়ে পাওয়া যায় আব্দুল কাদের মামার হালিম।
এই হালিমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ঘনত্বের ভারসাম্য। এটি না খুব বেশি ঘন, না খুব পাতলা—বরং মাঝামাঝি। ফলে অনেকেই এটিকে সহজে খাওয়া যায় এমন হালিম বলে মনে করেন।
এখানে ব্যবহৃত মাংস সাধারণত বেশ নরম এবং ভালোভাবে রান্না করা থাকে। প্রতিটি চামচে ডাল ও মাংসের ভালো সমন্বয় পাওয়া যায়। এর বাইরে নলি হালিমের জন্য এটি বিশেষভাবে খ্যাত।
এলাকার অনেক নিয়মিত ক্রেতা বলেন, যারা ভারী হালিম খেতে চান না, তাদের জন্য এটি ভালো বিকল্প।
সেলিম ভাইয়ের শাহী হালিম
মোহাম্মদপুরের আরেকটি জনপ্রিয় নাম সেলিম ভাইয়ের শাহী হালিম। এটি পাওয়া যায় শেরশাহ সূরী রোডে, ঈদগাহ মাঠ থেকে একটু সামনে বায়তুল ফালাহ মসজিদের নিচে।
এই হালিমের স্বাদ তুলনামূলকভাবে কড়া ও মসলাদার। অনেকেই বলেন, এটি খেতে একটু স্পাইসি—অর্থাৎ মসলার প্রভাব বেশ স্পষ্ট।
ঘনত্বও ভালো, ফলে যারা ঘন ও শক্তিশালী স্বাদের হালিম পছন্দ করেন তাদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়।
কাশেম মামার হালিম
শিক কাবাবের শাখার বিপরীতে সেলিম কাবাবের আরেকটি শাখায় বিক্রি হয় চাপ, ব্রেন ফ্রাই, বটি কাবাব। এর একটু সামনেই পাওয়া যায় কাশেম মামার হালিম। এটি মনা মামার দোকানের বিপরীত দিকে।
এই হালিমের ডাল মোটামুটি ঘন এবং মাংসের মানও ভালো। তবে এর আসল আকর্ষণ হলো এর স্বাদের সূক্ষ্ম ভিন্নতা।
অনেকেই বলেন, একই এলাকায় এতগুলো হালিমের দোকান থাকলেও কাশেম মামার হালিমের একটা আলাদা চরিত্র আছে।
মসলার মিশ্রণে এমন কিছু রয়েছে যা এটিকে অন্যগুলোর থেকে একটু আলাদা করে তোলে।
মুন্না মামার হালিম
মোহাম্মদপুরের হালিমের তালিকায় একটু ব্যতিক্রমী বলা যায় মুন্না মামার হালিমকে।
এটি সেলিম কাবাবের চাপ, বটি কাবাব ও ব্রেন ফ্রাই বিক্রির শাখার পাশেই পাওয়া যায়।
এই হালিমের কয়েকটি আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে—বেশ ঘন টেক্সচার, স্বাদে হালকা টকভাব এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য—এর মধ্যে দেওয়া হয় কোয়েল পাখির ডিম।
এটি হালিমের স্বাদে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। অনেক ক্রেতা বলেন, ডালের ঘনত্ব ও এই ডিমের কারণে হালিমটি অন্য সব হালিম থেকে আলাদা মনে হয়।
কেন মোহাম্মদপুরের হালিম এত জনপ্রিয়?
মোহাম্মদপুরের হালিমের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এখানে বেশিরভাগ বিক্রেতাই বহু বছর ধরে একই জায়গায় ব্যবসা করছেন। ফলে তাদের একটি বিশ্বস্ত ক্রেতা শ্রেণি তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দোকানের নিজস্ব স্বাদ রয়েছে। একই এলাকায় কয়েকটি দোকানে ঘুরে হালিম খেলে বোঝা যায়—ডালের ঘনত্ব, মসলার ব্যবহার, মাংসের পরিমাণ—সবকিছুতেই রয়েছে পার্থক্য।
তৃতীয়ত, মোহাম্মদপুরের খাবারের সংস্কৃতি নিজেই বেশ শক্তিশালী। কাবাব, চাপ, বটি, ব্রেন ফ্রাই—এসব খাবারের পাশাপাশি হালিম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ঢাকার অনেক জায়গাতেই ভালো হালিম পাওয়া যায়। কিন্তু মোহাম্মদপুরের বিশেষত্ব হলো—এখানে একটি ছোট এলাকার মধ্যেই বহু ধরনের হালিমের স্বাদ পাওয়া যায়।
এক সন্ধ্যায় কয়েকটি দোকানে ঘুরে কয়েক ধরনের হালিম চেখে দেখা—এটাই যেন এখানে খাবারপ্রেমীদের ছোট্ট এক অভিযান।
হয়তো সে কারণেই অনেকের কাছে মোহাম্মদপুর শুধু একটি এলাকা নয়—এটা এক ধরনের খাবারের মানচিত্র, যেখানে প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করে আছে নতুন স্বাদ। আর সেই মানচিত্রের অন্যতম আকর্ষণ—এই সাতটি হালিম।



