চিকেন হালিম কি আসলেই হালিম?
রোজার এই মাসে জনপ্রিয় একটি খাবার নিয়ে কিছু বিতর্কিত কথা তুলে ধরার জন্য প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। জনপ্রিয় সেই খাবারটি আপনাদের ইফতারির টেবিলে পেঁয়াজু আর খেজুরের বদলে স্বাদে ভিন্নতা এনে দেয়।
কথা বলছি আপনাদের পছন্দের হালিম নিয়ে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় চিকেন হালিম নামে যা বিক্রি হয়, তা নিয়ে কিন্তু বিতর্ক আছে। কারণ হালিমপ্রেমীদের মতে, চিকেন হালিম আসল হালিম নয়। তারা এটিকে হালিম হিসেবেই গণ্য করেন না!
আমরা এ বিষয়ে কয়েকজন হালিমপ্রেমীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম এবং তাদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম। কারণ খাবার শুধু খাওয়ার বিষয়ই নয়, স্বাদ ও ধরনভেদে নিজের পছন্দের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মানুষ সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে—আর তারাও ঠিক সেটাই করেছেন।
ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁর বাইরে ২৮ বছর বয়সী ফারহানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, চিকেন হালিম অনেকটা ল্যাটকা খিচুড়ির মতো—সুন্দরভাবে পরিবেশন করা হয় বটে, কিন্তু এর সঙ্গে কিছু সবজি যোগ করলেই সেটি একেবারে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত!’
তাহলে একবার ভেবে দেখুন, ফারহানকে ঠিক কেমন ‘হালিম’ পরিবেশন করা হয়েছিল, যে সেটি তার কাছে ল্যাটকা খিচুড়ির মতো মনে হয়েছে?
এরই মধ্যে তানভীর হালকা করে নিজের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে কথোপকথনে যোগ দিলেন, যেন যুক্তিতর্কের মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
‘হালিম কি আর এই সেদিনের খাবার? আরবে প্রথম হারিস রান্নার প্রচলন শুরু হয়। সেখান থেকে এটি পরে মুঘলদের রান্নাঘরে জায়গা করে নেয়, তারপর হায়দরাবাদের শাসকদের প্রিয় খাবার হয়ে ওঠে। একসময় সীমানা পেরিয়ে এই ঢাকাতেও এর প্রচলন শুরু হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে খাবারের এমন ঐতিহ্য ও প্রভাব চলে আসছে, আপনার কি মনে হয় মুরগি দিয়ে রান্না করে সেই স্বাদ, গন্ধ বা আভিজাত্যের ধারেকাছেও পৌঁছানো সম্ভব?’
অবনি হেসে বলেন, ‘আমরা বাঙালিরা কোনো রেসিপিকে সুনির্দিষ্ট একটি রেসিপি হিসেবে রাখতে পারি না। কোনো ট্র্যাডিশনাল খাবার দেখলেই সেটাকে নিয়ে কী করা যায় সেই চিন্তা আমাদের পেয়ে বসে—কখনো কিছু চিনি যোগ করি বা কিছু মশলা বাদের তালিকায় যোগ করি বা কখনো মাংসের জায়গায় সুলভ ও সহজলভ্য কিছু একটা দিয়ে রান্না করে ফেলি। এত কিছু পরিবর্তন করার পরও রান্না শেষ হলে আমরা জোর গলায় বলি, “এটাই একদম অথেনটিক রেসিপি।” আর ঠিক এভাবেই চিকেন হালিমের উদ্ভব ঘটেছে। সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়ে আজকের এই চিকেন হালিম তৈরি হয়নি। বরং আমাদের খামখেয়ালির ফল এই চিকেন হালিম।’
মুচকি হেসে তার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন, ‘একদিন আমার মা ইফতারের জন্য চিকেন হালিম বানিয়েছিলেন। আমার দাদি হালিমের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমরা কোনো মারাত্মক অন্যায় কাজ করে ফেলেছি। তিনি বললেন, “ডাল আর মুরগি? ভাত কোথায়? ভাত ছাড়া আমি এগুলো কীভাবে খাবো?” এরপর আর কখনো মা চিকেন হালিম রান্না করেননি।’
বিভা তার কথার মাধ্যমে যুক্তি খণ্ডন করলেন। ‘এটা আসলে খরচ আর সহজলভ্যতার ব্যাপার। মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে কম, সহজলভ্য এবং রান্না দ্রুত হয়। গরু ও খাসির মাংসকে মুরগির মতো সুলভ ও সহজলভ্য করে তুলুন, দেখবেন সবাই আবার বিফ আর মাটন হালিমের রেসিপিতে ফিরে গেছে। আর এভাবেই তো পরিবর্তন আসে, তাই নয় কি?’
কিন্তু বিভার কথায় কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলেন তানভীর। শান্তভাবেই তিনি বললেন, ‘মানিয়ে নেওয়া মানেই কোনো কিছুর মূল গুণগত মানের সঙ্গে আপস করা নয়। হ্যাঁ, রেসিপি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনই আদি রেসিপির মর্যাদা ধরে রাখতে পারে না। হালিম তৈরির ক্ষেত্রে গরুর মাংসটাকে দীর্ঘসময় ধরে জ্বাল দিয়ে সুসিদ্ধ করা হয়। আর এটাই হালিমের চিরাচরিত স্বাদের অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় একটি ধাপ। মুরগি দিয়ে হালিম রান্না করলে যেটা একেবারেই সম্ভব নয়। চাইলে এটাকে নতুন রেসিপি বলতে পারেন। কিন্তু হালিম রান্নার ক্ষেত্রে গরুর মাংসকে মূল উপকরণ বা ভিত্তি বলা যেতে পারে। আপনি যদি কোনো একটি নির্মাণের মূল ভিত্তিকে অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করেন, তাহলে সেই নির্মাণকাজটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অচিরেই ধসে পড়বে।’
এই ব্যাপারে অবশ্য তানভীরের কথা যুক্তিসঙ্গত। কারণ, আপনি চাইলে গার্নিশিং আপনার মতো করে করতে পারেন, রান্নার সময় তাপটা কম বা বেশি করে রান্না করতে পারেন—রেসিপিতে এই ধরনের ছোটখাটো পরিবর্তন ঠিক আছে। কিন্তু যদি আপনি রান্নার মূল দুটি উপকরণ মাংস ও গমের সমীকরণটাই বদলে দেন, তাহলে আপনি রেসিপি শুধু সামান্য পরিবর্তন করছেন না, বরং পুরো রেসিপিটিই বদলে ফেলছেন!
সবার মধ্যে থেকে আরেকজন বললেন, ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অনেকেই গরু বা খাসির মাংস খেতে পারেন না, তাদের জন্য চিকেন হালিম একদম উপযুক্ত।’
এই কথার জবাবে আমি ও অন্যান্য হালিমপ্রেমীরা খানিকটা চোখ পাকিয়ে বললাম, ‘তাহলে এটাকে চিকেন স্ট্যু বলুন। চাইলে পরিজও বলতে পারেন। অন্য কোনো নামও দিতে পারেন। কিন্তু এটাকে হালিম বলা যাবে না। হালিম নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস, রান্নায় ধৈর্যের গল্প ও গৌরব—যা মুরগির হালিমে নেই।’
মুরগি দিয়ে হালিম রান্না করা কোনো গুরুতর অপরাধ নয়। আমরা কিন্তু সেটি বলছি না। বিভিন্ন কারণে, যেমন সহজলভ্যতা, এলার্জি, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় মানুষ মুরগি ব্যবহার করে রান্না করে। নিঃসন্দেহে, ইফতারের সময় এর ফলে অনেকেই এই খাবারটি খেতে পারেন মুরগি। আমরা এই ব্যাপারগুলো সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু এই বিষয়গুলো একে সত্যিকার হালিম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি দেয় না। সহজলভ্যতাকে অথেনটিসিটির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। চলুন এটিকে রান্নার একটি নতুন উদ্ভাবনী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করি। রান্নার সৃজনশীলতাকে কখনোই শুধুমাত্র সহজলভ্যতা দিয়ে বিচার করা যায় না।
তবে হ্যাঁ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, অর্থনৈতিক দিক বা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যদি মুরগি ব্যবহার করতে হয়, তবে করুন। কিন্তু এই রান্নাকে সঠিক নাম দিন—হালিম নয়। কারণ এর সঙ্গে ইতিহাস, ধৈর্য নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার অনুশীলন বা গৌরবগাঁথা কিছুই জড়িত নয়।
তাহলে শেষমেশ কী দাঁড়াল? যদি আপনি ভেবে থাকেন যে চিকেন হালিম সুদীর্ঘ সময় নিয়ে রান্না করা হালিমের জায়গায় নিজের প্রতিনিধিত্ব করবে, তাহলে বলতেই হয় ঐতিহ্য নয়, বরং পর্দার আড়ালের ভুল ছায়াকে অনুসরণ করছেন আপনি।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী



