ইফতারে একবারে কত ক্যালরি গ্রহণ করছেন?

তাফহিমাহ জাহান নাহিন
তাফহিমাহ জাহান নাহিন

রমজান মাসে ইফতারের সময়টি শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও পারিবারিক দিক থেকেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সারাদিনের রোজা শেষে টেবিলে সাজানো থাকে নানা পদ—খেজুর, ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু, সমুচা, হালিম, শরবত। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুধা বেশি থাকে। এই ক্ষুধার তাড়নায় অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার খেয়ে ফেলি। কিন্তু সচরাচর কেউ হিসাব করে দেখেন না—এই এক বসাতেই কত ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করছে।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন এমএইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল। তার ভাষায়, ‘ইফতার আমরা সাধারণত ভাজাপোড়া দিয়ে শুরু করি। কিন্তু অনেকে বুঝতেই পারেন না, অল্প সময়ের মধ্যেই এক থেকে দুই প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি খেয়ে ফেলছেন।’

১ প্লেট ভাত: তুলনার সহজ মানদণ্ড

বাংলাদেশে এক প্লেট রান্না করা ভাত সাধারণত ২৫০–৩০০ গ্রাম হয়ে থাকে। ৩০০ গ্রাম ভাত থেকে গড়ে ৩৮০–৪০০ ক্যালরি পাওয়া যায়। সহজ হিসাবে ধরা যায়—১ প্লেট ভাত ≈ ৪০০ ক্যালরি।

পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল বলেন, ভাতের সঙ্গে তুলনা করলে মানুষ সহজে বুঝতে পারে তারা কতটা ক্যালরি গ্রহণ করছে। কারণ ভাত আমাদের দৈনন্দিন খাবারের পরিচিত অংশ।

বেগুনি: ছোট দেখালেও ক্যালরি কম নয়

একটি মাঝারি আকারের বেগুনিতে গড়ে ৮৫–৯৫ ক্যালরি থাকে। ডিপ ফ্রাই করার সময় বেসনের প্রলেপ ও বেগুন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল শোষণ করে, যা ক্যালরি বাড়িয়ে দেয়।

অর্থাৎ চার থেকে পাঁচটি বেগুনি খেলেই প্রায় ৩৬০–৪৫০ ক্যালরি হয়ে যায়, যা এক প্লেট ভাতের সমান বা কাছাকাছি। ইফতারের সময় অনেকে অনায়াসেই ৪–৬টি বেগুনি খেয়ে ফেলেন। ফলে মূল খাবার শুরু করার আগেই এক প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যায়।

পেঁয়াজু ও সমুচা: অল্পতেই বেশি শক্তি

একটি মাঝারি পিয়াজুতে থাকে প্রায় ৭০–৮০ ক্যালরি। পাঁচ থেকে ছয়টি পিয়াজু খেলেই প্রায় ৩৫০–৪৮০ ক্যালরি হয়ে যায়, যা প্রায় এক প্লেট ভাতের সমান।

সমুচার ক্ষেত্রে ক্যালরি আরও বেশি। একটি মাঝারি সমুচায় প্রায় ১৩০–১৫০ ক্যালরি থাকে। মাত্র তিনটি সমুচা খেলেই প্রায় ৪০০ ক্যালরি হয়ে যায়—অর্থাৎ এক প্লেট ভাতের সমান শক্তি।

পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল বলেন, সমস্যা একদিনের নয়। রমজানজুড়ে প্রতিদিন যদি অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ হয়, তবে মাস শেষে ওজন বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

শরবত: ‘লিকুইড ক্যালরির নীরব ফাঁদ’

ইফতারে মিষ্টি শরবত অনেকেরই পছন্দ। কিন্তু এক গ্লাস চিনি দেওয়া শরবতে প্রায় ১২০–১৮০ ক্যালরি থাকতে পারে। দুই গ্লাস শরবত খেলেই অতিরিক্ত ২৫০–৩০০ ক্যালরি যুক্ত হয়ে যায়।

এই পুষ্টিবিদ বলেন, ‘তরল ক্যালরি পেট ভরায় না, কিন্তু শক্তি যোগ করে। ফলে মানুষ বুঝতেই পারে না কতটা অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে ঢুকে যাচ্ছে।’

একবারে খাওয়ার বাস্তব হিসাব

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ইফতারে খেলেন—

তিনটি বেগুনি (≈ ২৭০ ক্যালরি)
দুটি পেঁয়াজু (≈ ১৫০ ক্যালরি)
একটি সমুচা (≈ ১৪০ ক্যালরি)
এবং এক গ্লাস শরবত (≈ ১৫০ ক্যালরি)

এক্ষেত্রে মোট ক্যালরি দাঁড়ায় প্রায় ৭০০–৭৫০।

অর্থাৎ মূল খাবার শুরু করার আগেই প্রায় দুই প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও সঙ্গে ছোলা ভুনাতে থাকে প্রায় ২৫০ ক্যালরি, সঙ্গে জিলাপি, বুন্দিয়া থেকেও ক্যালরি পাওয়া যায়। এরপর যদি রাতের খাবারে ভাত বা রুটি খাওয়া হয়, তবে দৈনিক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করা হয়ে যায়।

ক্যালরির উৎস কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভাতের ক্যালরি প্রধানত কার্বোহাইড্রেট থেকে আসে এবং এতে তেলের পরিমাণ কম। কিন্তু বেগুনি, পেঁয়াজু ও সমুচার ক্যালরির বড় অংশ আসে তেল থেকে।

ডিপ ফ্রাই করা খাবার উচ্চমাত্রার চর্বি সরবরাহ করে, যা হজমে চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি, রক্তে কোলেস্টেরল বাড়া ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ভারসাম্যপূর্ণ ইফতার: কীভাবে সম্ভব?

ইফতার শুরু করুন খেজুর ও পানি দিয়ে। এরপর ফল ও সালাদ রাখুন। ভাজা খাবার ১–২টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

মিষ্টি শরবতের পরিবর্তে কম চিনি বা চিনি ছাড়া পানীয় বেছে নেওয়া এবং ধীরে ধীরে খাওয়ার অভ্যাসও অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করে।

সংযমই সুস্থতার চাবিকাঠি

রমজানের মূল শিক্ষা সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। সেই সংযম যদি ইফতারের টেবিলেও বজায় রাখা যায়, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অজান্তেই কয়েকটি বেগুনি, পেঁয়াজু ও সমুচা মিলিয়ে এক বসায় একাধিক প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি খেয়ে ফেলা খুবই সহজ। তাই ইফতারে আনন্দ থাকুক, বৈচিত্র্য থাকুক, কিন্তু সচেতনতা থাকুক সবার আগে। কারণ সচেতন সিদ্ধান্তই পারে রমজানকে করতে সুস্থ ও সুরক্ষিত।