দূষণের ভিড়ে নির্মল শ্বাস নেওয়া যায় যে ২০ রাজধানী শহরে
প্রতিদিন সকালে জানালা খুললে আমরা যে বাতাস প্রশ্বাসে টেনে নিই, সেটি আসলে কতটা বিশুদ্ধ—এই প্রশ্ন এখন পৃথিবীর প্রায় সব নগরবাসীর মনেই জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী শহরগুলো, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব, শিল্পকারখানা ও যানবাহনের চাপ সবচেয়ে বেশি, সেখানে পরিষ্কার বাতাস যেন একপ্রকার বিলাসিতা। অথচ, পৃথিবীতে এমন কিছু রাজধানী আছে, যারা দূষণের এই প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেদের বাতাসকে আশ্চর্যভাবে পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর রাখতে পেরেছে।
সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাতাসের মান (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই) পর্যবেক্ষণ করে। এই সূচকে ০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত স্কোরের মাধ্যমে বোঝানো হয়, কোনো এলাকার বাতাস কতটা শুদ্ধ বা দূষিত। ৫০-এর নিচের একিউআই মানে ‘ভালো’ বা পরিষ্কার বাতাস; আর ৩০০-এর উপরে গেলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ‘অত্যন্ত ক্ষতিকর’ ধরা হয়।
আইকিউএয়ারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ২০টি রাজধানী শহর ৫০-এর নিচে একিউআই বজায় রেখে নিজেদের পরিচ্ছন্ন নগর পরিবেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আসুন, দেখে নেওয়া যাক এই শহরগুলো কোনগুলো এবং কীভাবে তারা দূষণকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
১. অসলো, নরওয়ে (একিউআই: ১৩)
উত্তর ইউরোপের ছোট কিন্তু আধুনিক রাজধানী অসলো এখন বিশ্বের সবচেয়ে পরিষ্কার বাতাসের শহরগুলোর শীর্ষে। নরওয়ের মানুষ পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে অভ্যস্ত। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার এখানে সবচেয়ে বেশি এবং সরকারি নীতিতেও কার্বন নির্গমন কমানোর কড়াকড়ি রয়েছে। বরফঢাকা পাহাড় আর সবুজ বনের মাঝখানে ঘেরা এই শহরটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির সুনিবিড় মেলবন্ধনের প্রতীক।
২. ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (একিউআই ১৬)
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ওয়াশিংটন ডিসি সবসময় ব্যস্ত এক শহর। কিন্তু এর পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা এবং প্রচুর সবুজ জায়গা দূষণ কমাতে সহায়তা করেছে। শহরজুড়ে বৈদ্যুতিক বাস, সাইকেল লেন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে। এখানকার জনগণও পরিবেশ সচেতন—রিসাইক্লিং থেকে শুরু করে প্লাস্টিক বর্জন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে যত্নশীল।
৩. হেলসিঙ্কি, ফিনল্যান্ড (একিউআই: ১৯)
ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় থাকে। ঠান্ডা আবহাওয়া, সীমিত শিল্প এলাকা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে হেলসিঙ্কির বাতাস প্রায় নিখুঁতভাবে বিশুদ্ধ। সরকারও ‘কার্বন-নিউট্রাল সিটি’ হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।
৪. স্টকহোম, সুইডেন (একিউআই: ২০)
সুইডেন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অগ্রদূত। স্টকহোমে গণপরিবহন ব্যবস্থায় অধিকাংশ বাস বায়োফুয়েল ব্যবহার করে এবং শহরে প্রচুর গাছপালা ও জলাশয় বাতাসকে শুদ্ধ রাখে। এখানকার মানুষও পরিবেশকে জীবনের অংশ হিসেবে দেখে।
৫. সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া (একিউআই: ২২)
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল একসময় শিল্পায়নের কারণে দূষণের শিকার ছিল। কিন্তু এখন তারা সফলভাবে পরিস্থিতি বদলে ফেলেছে। সরকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শক্ত আইন করেছে এবং ‘সবুজ শহর’ প্রকল্প চালু করেছে, যার ফলে একিউআই নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
৬. কিয়েভ, ইউক্রেন (একিউআই: ২৩)
যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়েও কিয়েভ তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তুলনামূলক কম যানবাহন ও স্থানীয় উৎপাদন নির্ভর অর্থনীতি এই শহরের বাতাসকে শুদ্ধ রাখতে ভূমিকা রাখছে।
৭. কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক (একিউআই: ২৪)
বিশ্বের সবচেয়ে সাইকেলবান্ধব শহরগুলোর মধ্যে কোপেনহেগেন অন্যতম। এখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশ অফিসে যায় সাইকেল চালিয়ে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি ও সামুদ্রিক হাওয়ার কারণে শহরের বাতাস সর্বদা সতেজ।
৮. ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া (একিউআই: ২৫)
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা সবুজ পাহাড় ও বনাঞ্চলে ঘেরা। এখানে দূষণকারী শিল্প খুবই সীমিত এবং সরকারি ভবনগুলোতেও সোলার প্যানেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তাই শহরের আকাশ সবসময় নীল আর নির্মল।
৯. রোম, ইতালি (একিউআই: ২৮)
রোম ইতিহাসে সমৃদ্ধ হলেও আধুনিক পরিবেশ সচেতনতার দিকেও পিছিয়ে নেই। শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে ‘লো এমিশন জোন’ চালু হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ফল দিচ্ছে।
১০. অ্যামস্টারডাম, নেদারল্যান্ডস (একিউআই: ২৮)
সাইকেল আর খালের শহর অ্যামস্টারডামেও বায়ুদূষণ কম। বৈদ্যুতিক নৌকা, ট্রাম ও সাইকেল পরিবহন এখানকার জীবনযাত্রার মূল অংশ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে পেট্রলচালিত যানবাহন নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
১১. মস্কো, রাশিয়া (একিউআই: ৩১)
বৃহৎ জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মস্কোতে প্রচুর গাছপালা ও সবুজ পার্ক বাতাসকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। শীতকালীন ঠান্ডা হাওয়াও দূষণ কমাতে সাহায্য করে।
১২. লন্ডন, যুক্তরাজ্য (একিউআই: ৩৩)
একসময় লন্ডন ‘গ্রেট স্মগ’-এর জন্য কুখ্যাত ছিল। কিন্তু এখন তা অতীত। আধুনিক প্রযুক্তি, কম কার্বন নির্গমন নীতি এবং ‘আল্ট্রা লো এমিশন জোন’ প্রবর্তনের ফলে লন্ডন অনেকটাই বদলে গেছে।
১৩-১৬. বোগোটা, বুদাপেস্ট, বার্লিন ও ভিয়েনা (একিউআই: ৩৯)
এই চারটি শহর ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুটি মহাদেশে হলেও পরিবেশ রক্ষায় এক সুরে কাজ করছে। গণপরিবহন ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পুরোনো গাড়ির নিষেধাজ্ঞা এবং শহুরে বন প্রকল্প—সব মিলিয়ে তাদের একিউআই ৪০-এর নিচে রাখতে পেরেছে।
১৭. বুখারেস্ট, রোমানিয়া (একিউআই: ৪১)
বুখারেস্টে এখনো উন্নয়নশীল শহরের কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচি শহরজুড়ে বাতাসকে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার রেখেছে।
১৮. ব্রাসেলস, বেলজিয়াম (একিউআই: ৪৩)
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক কেন্দ্র ব্রাসেলস তার কঠোর পরিবেশ নীতির জন্য পরিচিত। সাইকেল পথ ও ট্রামের প্রসার শহরটিকে কম দূষিত করেছে।
১৯. আলজিয়ার্স, আলজেরিয়া (একিউআই: ৪৪)
আফ্রিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত এই শহরটি ভূমধ্যসাগরীয় বাতাসের জন্য উপকৃত। যদিও শিল্প কার্যক্রম বাড়ছে, তবে সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী দূষণ এখনো নিয়ন্ত্রণে।
২০. কাম্পালা, উগান্ডা (একিউআই: ৪৯)
আফ্রিকার হৃদয়ে অবস্থিত কাম্পালা প্রমাণ করেছে, উন্নয়নশীল দেশও চাইলে পরিচ্ছন্ন বাতাস রাখতে পারে। পাহাড়ি পরিবেশ ও সাগরবায়ুর কারণে এখানকার দূষণ অনেক কম।
দূষণমুক্ত শহরের রহস্য
এই ২০টি রাজধানীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, বাতাসের মান কেবল ভৌগোলিক সৌভাগ্যের বিষয় নয়; বরং সচেতন পরিকল্পনা, সবুজ নীতি ও জনগণের অংশগ্রহণই মূল চাবিকাঠি। গণপরিবহনের উন্নয়ন, সাইকেল ব্যবহারের উৎসাহ, নবায়নযোগ্য শক্তি, এবং সবুজ এলাকা বৃদ্ধি—এই চারটি পদক্ষেপ প্রায় প্রতিটি শহরের সাফল্যের ভিত্তি।
আমাদের জন্য শিক্ষা
ঢাকা, দিল্লি বা বেইজিংয়ের মতো দূষণ-পীড়িত শহরগুলোর জন্য এই তালিকা অনুপ্রেরণা হতে পারে। রাজধানী মানেই ধোঁয়া, ট্রাফিক আর ঘন ভবনের শহর—এই ধারণা এখন আর সর্বজনীন নয়। প্রযুক্তি, নীতি ও সচেতনতার মিশেলে পরিচ্ছন্ন বাতাসও সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, প্রশ্বাসের প্রতিটি কণাই জীবনের অংশ। যেসব শহর নিজেদের বাতাস রক্ষা করছে, তারা আসলে মানুষের স্বাস্থ্য, মনোভাব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ করছে। কারণ, নির্মল বাতাস শুধু পরিবেশের নয়—এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক উন্নতির প্রতীক।