শিশু কখন নিজের নাম চিনতে পারে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সন্তানের নাম ঠিক করতে গিয়ে বাবা-মা কতই না ভাবনা-চিন্তা করেন! কেউ পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান, কেউ আবার একেবারে নতুন ও সুন্দর নাম খোঁজেন। কারণ এই নামটাই তাকে সারা জীবন শুনতে হবে।

কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, শিশু কীভাবে বুঝতে শেখে একটি বিশেষ শব্দই তার নাম? আর কীভাবে সে বুঝতে পারে, ওই শব্দ ধরে ডাকলেই তাকে সাড়া দিতে হবে?

যুক্তরাজ্যের স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট জ্যানেট কুপার এ বিষয়ে বিবিসিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন।

জ্যানেট কুপারের মতে, বেশিরভাগ শিশু ৭ থেকে ৯ মাস বয়সের মধ্যে নিজের নাম বুঝতে শুরু করে। তবে নাম বুঝতে পারা বা চেনার প্রক্রিয়া তারও আগে শুরু হয়। প্রথম দিকে শিশুরা নামের শব্দের চেয়ে এর সুর ও ছন্দ বেশি ধরতে পারে।

জ্যানেট তার নাতির উদাহরণ দেন। তার নাতির নাম অ্যাক্সেল। পরিবারের সবাই নামটি উচ্চারণ করেন একটু ওঠানামা করা সুরে, ‘অ্যাক্স-এল’। শিশুরা প্রথমে এই ছন্দটাই চিনে নেয়। পরে ধীরে ধীরে নামের আসল শব্দগুলোও চিনতে শেখে।

অর্থাৎ, শিশু প্রথমে বুঝতে শুরু করে যে, একটি নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ সে বারবার সবার মুখে শুনছে।

প্রথম দিকে শিশুরা নামের শব্দের চেয়ে এর সুর ও ছন্দ বেশি ধরতে পারে।
প্রথম দিকে শিশুরা নামের শব্দের চেয়ে এর সুর ও ছন্দ বেশি ধরতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

শিশুরা কীভাবে নাম শুনে সাড়া দিতে শেখে

এর উত্তর খুবই সহজ, বারবার শোনার মাধ্যমে।

যখন বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা বারবার শিশুর নাম ধরে ডাকেন, তখন সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে এই শব্দটি তার জন্যই বলা হচ্ছে।

ধরুন, আপনি সন্তানের নাম ধরে ডাকলেন। সে সেই শব্দ শুনে আপনার দিকে তাকাল। তারপর আপনি হাসলেন, কথা বললেন বা তাকে কোলে নিলেন। এ ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে শিশুর মস্তিষ্কের সঙ্গে ওই শব্দের এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। সে তখন বুঝে নেয়, এই শব্দটি শুনলেই বুঝতে হবে—আমাকে ডাকা হচ্ছে।

আর একটি বিষয়ও এখানে কাজ করে। শিশুরা মনোযোগ পেতে খুব ভালোবাসে। নিজের নাম শুনে সাড়া দিলে তারা বাবা-মায়ের আরও মনোযোগ পায়। ফলে তারা নাম বোঝার বিষয়টি দ্রুত শিখে ফেলে।

শিশু প্রথমে বুঝতে শুরু করে যে, একটি নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ সে বারবার সবার মুখে শুনছে। ছবি: সংগৃহীত
শিশু প্রথমে বুঝতে শুরু করে যে, একটি নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ সে বারবার সবার মুখে শুনছে। ছবি: সংগৃহীত

শিশুকে নাম শেখাতে কী করা যায়

শিশুকে নিজের নাম চেনাতে বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের সাধারণ যোগাযোগই যথেষ্ট।

শুরুতে তার নাম বারবার ব্যবহার করুন। শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় তার নাম যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত ভালো।

যেমন ‘আয়দিন, তুমি কি খাবার খাবে?’

‘ইশাম, এখন ডায়াপার বদলানোর সময়।’

প্রতিদিন বারবার নিজের নাম শুনতে শুনতেই শিশুর মস্তিষ্ক শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে।

এছাড়া মনোযোগ নষ্ট হয় এমন বিষয় কমাতে হবে। অনেক সময় শিশুর আশপাশে এত কিছু ঘটে যে, সে আপনার কথায় মনোযোগ দিতে পারে না। তাই মাঝে মাঝে একটু শান্ত পরিবেশে নিয়ে যান।

তার হাতে একটি খেলনা দিন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। তারপর নাম ধরে ডাকুন। দেখুন সে আপনার দিকে তাকায় কি না।

মাঝে মাঝে কণ্ঠস্বর বদলে দেখতে পারেন। একই ভঙ্গিতে বারবার ডাকলে শিশু অনেক সময় আগ্রহ হারাতে পারে। কখনো গানের সুরে, কখনো ফিসফিস করে, আবার কখনো আনন্দভরা কণ্ঠে তার নাম বলুন। বেশিরভাগ শিশুই কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনের প্রতি খুব সংবেদনশীল।

করে। শিশুরা মনোযোগ পেতে খুব ভালোবাসে।
করে। শিশুরা মনোযোগ পেতে খুব ভালোবাসে। ছবি: সংগৃহীত

কখনো কখনো পরিবারের ছবি নিয়ে শিশুর সঙ্গে বসুন। ছবিতে যাদের দেখছেন, তাদের নাম বলুন।

যখন শিশুর নিজের ছবি আসবে, তখন বলুন, ‘দেখো, এটা আয়দিন।’

‘কী সুন্দর হাসছে ইশান।’

এভাবে নাম ও নিজের চেহারার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।

জ্যানেট বলেন, প্রতিদিনের কথাবার্তায় যত বেশি সম্ভব শিশুর নাম ব্যবহার করা ভালো।

যেমন, শিশু যদি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, তখন নাম ধরে ডাকতে পারেন। এতে সে শব্দটি কোথা থেকে আসছে তা জানতে মাথা ঘুরিয়ে আপনার দিকে তাকাবে।

তিনি বলেন, শিশুর মনোযোগ আকর্ষণ করতে নাম ব্যবহার করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত প্রায় ৬ মাস বয়স থেকে শিশুরা শব্দ শুনে মাথা ঘোরাতে শুরু করে।

এছাড়া গান, ছড়া ও খেলাধুলার মাধ্যমেও নাম শেখানো যায়। প্রতিদিনের বিভিন্ন খেলায়, গানে ও ছড়ার মধ্যে ছন্দে ছন্দে শিশুর নাম ধরে ডাকলে ওরা সহজে নিজের নাম বুঝতে ও শিখতে পারে।

জ্যানেট হাসতে হাসতে বলেন, অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, দুই বছর বয়সের পর বাচ্চারা নাম শুনে সাড়া দিতে চায় না। এর কারণ হলো, আসলে তখন তারা বুঝে যায়, চাইলে নাম শুনে না শোনার ভানও করা যায়!

নিজের নাম শুনে সাড়া দিলে তারা বাবা-মায়ের আরও মনোযোগ পায়।
নিজের নাম শুনে সাড়া দিলে তারা বাবা-মায়ের আরও মনোযোগ পায়। ছবি: সংগৃহীত

নিজের নাম বোঝা কেন গুরুত্বপূর্ণ

নিজের নাম চেনা একটি শিশুর আত্মপরিচয় গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

যখন শিশু নিজের নাম শুনে সাড়া দেয়, তখন তার মনোযোগ নির্দিষ্ট দিকে যায়। এতে সে আশপাশের মানুষ, ঘটনা ও পরিবেশ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে শেখে।

শুধু তাই নয়, নিজের নাম বুঝতে না পারলে তা অন্য যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্যানেট এ বিষয়ে একটি বাস্তব ঘটনার কথা বলেন।

একটি স্কুল থেকে তাকে জানানো হয়েছিল, একটি শিশু নাকি কিছুই বুঝতে পারে না। এমনকি নিজের নাম ধরে ডাকলেও সাড়া দেয় না।

কিন্তু জ্যানেট শিশুটির সঙ্গে কাজ করে বুঝলেন, তার বোঝার ক্ষমতা ঠিকই আছে।

পরে তিনি শিশুটির মা ও শিক্ষককে একসঙ্গে বসান। তখন দেখা যায়, মা যেভাবে নামটি উচ্চারণ করেন, স্কুলে শিক্ষকরা সেটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বলেন।

ফলে শিশুটি বুঝতেই পারেনি যে, দুটো উচ্চারণ আসলে একই নাম।

যেসব শব্দ মুখের সামনের অংশে তৈরি হয়, সেগুলো শিশুদের জন্য সবচেয়ে সহজ।
যেসব শব্দ মুখের সামনের অংশে তৈরি হয়, সেগুলো শিশুদের জন্য সবচেয়ে সহজ। ছবি: সংগৃহীত

কোন ধরনের নাম উচ্চারণ করা সহজ

জ্যানেটের মতে, যেসব শব্দ মুখের সামনের অংশে তৈরি হয়, সেগুলো শিশুদের জন্য সবচেয়ে সহজ।

বিশেষ করে ‘ম’, ‘ব’ ও ‘প’ ধ্বনিযুক্ত শব্দ। কারণ এসব শব্দ বলার সময় ঠোঁট কীভাবে নড়ে, তা শিশুরা সহজেই দেখতে পারে।

যেমন ‘মামা’ বা ‘বাবা’ শব্দ উচ্চারণের সময় ঠোঁটের নড়াচড়া স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে শিশুরা দ্রুত এসব শব্দ শিখে ফেলে।

অন্যদিকে মুখের ভেতরের দিকে তৈরি হওয়া ধ্বনিগুলো তুলনামূলক কঠিন।

জ্যানেট মজা করে বলেন, যদি বাবা-মায়েরা কেবল সহজে উচ্চারণ করা যায় এমন নাম বেছে নিতেন, তাহলে পৃথিবীতে হয়তো অনেক ‘বব’ থাকত!

তিনি আরও বলেন, শিশুদের কার্টুন নির্মাতারাও বিষয়টি ভালো জানেন। তাই ‘পেপা পিগ’ বা ‘পোস্টম্যান প্যাট’ এর মতো নাম রাখা হয়। এসব নামের ধ্বনি শিশুদের কাছে পরিচিত ও সহজ, তাই তারা দ্রুত বলতে শেখে।

তবে সব শিশুই একই সময়ে এই দক্ষতা অর্জন করে না। কেউ একটু আগে, কেউ একটু পরে। এমনকি একই পরিবারের দুই ভাইবোনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা যেতে পারে।

শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় তার নাম যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত ভালো।
শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় তার নাম যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত ভালো। ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে বুঝবেন শিশু নিজের নাম বুঝতে শিখেছে

অনেক ছোট বয়স থেকেই শিশুরা মানুষের কণ্ঠস্বরের দিকে তাকায়। তাই শুধু আপনার দিকে তাকানো মানেই যে সে নিজের নাম চিনেছে, তা নয়।

আসল বিষয় হলো ধারাবাহিকতা।

যখনই আপনি তার নাম বলছেন, তখন কি সে বারবার আপনার দিকে তাকাচ্ছে? সে কি কোনো শব্দ করছে? হাসছে? অথবা অন্য কোনোভাবে সাড়া দিচ্ছে?

যদি এসব প্রতিক্রিয়া নিয়মিত দেখা যায়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সে নিজের নাম চিনতে শুরু করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশু ৪ থেকে ৬ মাস বয়সেই নিজের নাম চিনতে পারে। তবে বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে এটি ৭ থেকে ৯ মাস বয়সে নিয়মিতভাবে দেখা যায়।

কিছু শিশু ৪ থেকে ৬ মাস বয়সেই নিজের নাম চিনতে পারে।
কিছু শিশু ৪ থেকে ৬ মাস বয়সেই নিজের নাম চিনতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

শিশু কবে নিজের নাম বলতে পারে

মজার বিষয় হলো, শিশুরা সাধারণত নিজের নাম চিনতে শেখে অনেক আগে, কিন্তু নিজের নাম বলতে শেখে বেশ পরে। কারণ বোঝা আর বলা—দুটি আলাদা দক্ষতা।

একটি শিশু ৯ মাস বয়সের মধ্যে নিজের নাম চিনতে পারলেও নিজের নাম উচ্চারণ করতে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

আর পুরো নাম সাধারণত ২ থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে স্পষ্টভাবে বলতে দেখা যায়।

নিজের নাম বলতে শেখাতে কী করা যায়

এ জন্য একটি সহজ খেলা খেলতে পারেন।

শিশুকে জিজ্ঞেস করুন—

‘তোমার নাম কী?’

তারপর নিজেই ধীরে ধীরে উত্তর দিন—

‘তোমার নাম আয়দিন।’

এভাবে বারবার করলে একসময় দেখা যাবে, উত্তরটি আপনি দেওয়ার আগেই সে নিজে বলতে শুরু করেছে। তবে মনে রাখতে হবে, সব নাম সমান সহজ নয়।

ছোট ও সহজ নাম শিশুদের মুখে দ্রুত আসে। অন্যদিকে বড় বা বহু অক্ষরের নাম বলতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে।
তাই যদি নামটি অনেক বড় হয়, তাহলে শুরুতে একটি ছোট ডাকনাম ব্যবহার করা যেতে পারে।