শিশু খেতে চায় না, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার উপায়
শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কেবল পুষ্টিকর খাবার সামনে দিলেই হবে না, ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, সন্তান শাক-সবজি খেতে চায় না। তারা ফলের বদলে চিপস বা চকলেট চায়।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে শিশুকে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।
শিশুর মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে ইউনিসেফের পরামর্শগুলো জেনে নিন।
নিজেই হোন সন্তানের আদর্শ
শিশুরা বড়দের দেখেই শেখে। তাই সন্তানের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে আগে নিজেকে সেই অভ্যাস মেনে চলতে হবে। পরিবারের সদস্যরা যদি নিয়মিত ফলমূল, শাক-সবজি, দুধ, দই ও শস্যজাত খাবার খান, তাহলে শিশুও স্বাভাবিকভাবে সেগুলোর প্রতি আগ্রহী হবে।
খাবার বা শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য নয়
ইউনিসেফ বলছে, কেউ কী খাচ্ছে, কতটুকু খাচ্ছে কিংবা কার শরীরের গঠন কেমন—এসব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা উচিত নয়। শিশুদের সামনে অন্যের ওজন বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সমালোচনা করলে তাদের মনেও ভুল ধারণা জন্মাতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনেক শিশুই ধীরে ধীরে খেতে পছন্দ করে। তাই তাদের তাড়া না দিয়ে ধৈর্য ধরাই ভালো।
প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত চিনি-লবণযুক্ত খাবার কমান
অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার শিশুর ওজন বৃদ্ধি এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই ঘরে এসব খাবারের উপস্থিতি কমাতে হবে। এর বদলে তাজা ফল, ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর মিষ্টান্ন, দুধ বা ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। কারণ শিশুরা সাধারণত হাতের কাছে যা পায়, সেটিই বেশি খেতে চায়।
রান্না ও খাবার তৈরিতে শিশুকে সঙ্গে রাখুন
খাবার তৈরির কাজে অংশ নিলে শিশুরা নতুন খাবার চেখে দেখতে বেশি আগ্রহী হয়। তাদের বাজারে বা কাঁচাবাজারে নিয়ে যান, ফল ও সবজি বাছাই করতে দিন। সপ্তাহের খাবারের তালিকা তৈরিতে তাদের মতামত নিন। স্কুলের টিফিন তৈরি কিংবা সপ্তাহ শেষে সকালের নাশতা সাজানোর মতো ছোট ছোট দায়িত্বও দিতে পারেন।
একইসঙ্গে ফলের সালাদ তৈরি বা কোন সবজি রান্না হবে তা শিশুকে বেছে নিতে দিতে পারেন। তাহলে তার মধ্যে খাবারের প্রতি ইতিবাচক আগ্রহ তৈরি হবে।
নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া
নিয়মিত সময় মেনে খাবার ও হালকা নাশতা খাওয়ার অভ্যাস শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা কখন খেতে হবে তা বুঝতে শেখে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। নাশতার জন্য ফল, দই, বাদাম বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে পারেন।
প্রতিদিন অন্তত একটি খাবার পুরো পরিবার একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। খাওয়ার সময় টেলিভিশন, মোবাইল ফোন বা বইয়ের মতো বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলো দূরে রাখুন।
খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন
একই ধরনের খাবার বারবার না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করুন। ফল, শাক-সবজি, শস্যজাত খাবার ও দুগ্ধজাত খাদ্য সবকিছুই যেন শিশুর খাদ্যতালিকায় থাকে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। এতে শিশু নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান পাবে এবং নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হবে।
নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচয় করানো
শিশুর পছন্দের খাবারের সঙ্গে নতুন বা কম পছন্দের খাবার মিশিয়ে পরিবেশন করা যেতে পারে। যেমন পাস্তার সঙ্গে ব্রকলি বা অন্য কোনো সবজি যোগ করা।
মনে রাখতে হবে, কোনো নতুন খাবার প্রথমবার দেখেই শিশু খেতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নতুন খাবার গ্রহণ করতে শিশুর দশবারেরও বেশি চেষ্টা লাগতে পারে। তাই একবার না খেলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে বারবার সুযোগ দিন।
খাবার পরিবেশনের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো খাবার শিশুদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
খাবারকে পুরস্কার বা শাস্তির মাধ্যম না বানানো
অনেক সময় শিশুর ভালো আচরণের পুরস্কার হিসেবে চকলেট, চিপস বা অন্যান্য কম পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। এটি ঠিক নয়। এতে শিশুর মনে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে যে, এসব খাবারই সবচেয়ে মূল্যবান।
বরং ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করুন, একসঙ্গে পার্কে ঘুরতে যান কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দিন। বস্তুগত পুরস্কারের চেয়ে আন্তরিক প্রশংসা অনেক বেশি কার্যকর।
নিজের কথা শুনতে শেখান
শিশুকে বোঝান, ক্ষুধা লাগলে খেতে হবে এবং পেট ভরে গেলে থামতে হবে। জোর করে পুরো প্লেট শেষ করতে বলা বা ক্ষুধা না থাকলেও খাওয়ানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। এতে তার মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হতে পারে।
খাবারের সময়কে আনন্দময় করুন
খাবার খাওয়ার পরিবেশ যেন হয় স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময়। চাপ, বকাঝকা বা তর্ক-বিতর্কের মধ্যে খাওয়ালে খাবারের সঙ্গে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। বরং গল্প করতে করতে, হাসিখুশি পরিবেশে একসঙ্গে খেলে তারা খাবারকে ইতিবাচক হিসেবে নেবে।
শেষ কথা, শিশুর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা একদিনের কাজ নয়। এটি ধৈর্য, ভালোবাসা ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। অভিভাবক হিসেবে ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই শিশুকে সুস্থ, সবল ও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। আজ যে ভালো অভ্যাসগুলো তারা শিখবে, সেগুলোই তারা মানতে মানতে বেড়ে উঠবে।




