শিশুর জন্য মা-বাবার অভ্যাস কেন বদলাতে বলছে সুইডেন

maruf
মারুফ ইসলাম

সুইডেনের পাবলিক হেলথ এজেন্সি সম্প্রতি শিশুদের স্মার্টফোন ও ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। শুধু শিশু নয়, মা-বাবার স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাসও বদলাতে বলছে সুইডেন সরকার।

গত ১ জুন জারি করা নির্দেশনায় সুইডেন সরকার বলেছে, শিশুরা কেবল বড়দের কথা শুনে শেখে না, বরং বড়দের কাজ দেখে শেখে। পাবলিক হেলথ এজেন্সি গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মা যখন শিশুদের সামনে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করেন, তখন শিশুদের সঙ্গে তাদের গুণগত যোগাযোগ কমে যায়। যেসব বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে মগ্ন থাকেন, তাদের শিশুদের মধ্যেও একই ধরনের আসক্তি তৈরি হয়। তাই শিশুদের ডিজিটাল অভ্যাস বদলাতে হলে আগে বাবা-মায়েদের অভ্যাস বদলাতে হবে।

বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ

নতুন নির্দেশনায় সুইডেন সরকার বলেছে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনোভাবেই স্ক্রিন বা ফোন দেখতে দেওয়া যাবে না। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্মার্টফোন দেখতে দেওয়া যেতে পারে। আর ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা স্মার্টফোন দেখতে পারবে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা দিনে সর্বোচ্চ ৩ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করতে পারবে।

‘ফোনমুক্ত এলাকা’ ঘোষণা

ঘরের বিশেষ কিছু অংশ, যেমন শোবার ঘর এবং খাবারের টেবিলকে ‘ফোনমুক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে অনুরোধ করেছে সুইডেনের পাবলিক হেলথ এজেন্সি। সংস্থাটি বলছে, বসতঘরের কিছু অংশ ফোনমুক্ত রাখলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি কথা বলার সুযোগ বাড়ে এবং শিশুদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে না। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঘুমানোর অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগে শিশুদের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে হবে। এমনকি রাতে শোবার ঘরে ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটার রাখা যাবে না।

এছাড়া সুইডেন সরকার তাদের শিক্ষা আইনে পরিবর্তন এনে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে নবম শ্রেণি (১৫-১৬ বছর বয়স) পর্যন্ত স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়ানো এবং সাইবার বুলিং রোধ করার পাশাপাশি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমানো।

বাবা-মায়েদের প্রতি সুইডেন সরকার অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, আপনার শিশু সন্তানের ছবি বা ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করার আগে দুইবার ভাবুন। ইন্টারনেটে শিশুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সম্মান রক্ষায় সচেতন হোন। ইন্টারনেট একটি উন্মুক্ত মাধ্যম। এখান থেকে আপনার শিশুর ছবি ও ভিডিও নিয়ে অসৎ ব্যক্তিরা যেকোনো ধরনের অপব্যবহার করতে পারে।

কেন এই কড়াকড়ি

গত বছরের শরৎ মৌসুমে সুইডেন সরকার তাদের পাবলিক হেলথ এজেন্সিকে শিশুদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে মা-বাবার স্ক্রিন টাইমের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মোতাবেক গবেষণার পর সুইডেন সরকার অভিভাবকদের জন্য এই নতুন নির্দেশনা জারি করল।

দেশটির সামাজকল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী ইয়াকব ফরসমেড সুইডেনের এসভিটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মানুষ হয়তো এখনো বুঝতে পারছে না যে স্ক্রিন আসক্তি শিশুদের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলছে। এখনই এ ব্যাপারে সবার সচেতন হওয়া উচিত এবং মা-বাবাদের নিজেদের কিছু অভ্যাস বদলে ফেলা জরুরি।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে করা পাবলিক হেলথ এজেন্সির গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও একাকীত্ব বাড়ছে। এছাড়া শিশুরা অন্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ভাষা শেখা ও সামাজিক দক্ষতা ঠিকভাবে অর্জন করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিনের নীল আলো শিশুদের ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে বাধা দেয়। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুরা যেহেতু বড়দের দেখে শেখে, তাই মা বাবার অতিরিক্ত ফোনাসক্তি শিশুর ভেতরেও সংক্রমিত হয়।

পাবলিক হেলথ এজেন্সির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক হেলেনা ফ্রিলিংসডর্ফ বলেছেন, শিশুরা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের কথায় নয়, কাজের দ্বারাও প্রভাবিত হয়। এ কারণেই মা বাবাদের এমন অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যেসব অভ্যাস শিশুদের আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালে শিশুদের জন্য একই ধরনের নির্দেশনা জারি করেছিল। ওই নির্দেশনায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ডিজিটাল স্ক্রিনের চেয়ে সরাসরি খেলাধুলা ও পর্যাপ্ত ঘুম অনেক বেশি কার্যকর বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, পাবলিক হেলথ এজেন্সি অব সুইডেন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা