মিয়ানমারে জান্তার বিমান হামলার রসদ যোগাচ্ছে ইরান?

মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান
মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

আর অল্প কয়েকদিন পরেই মিয়ানমারে জেনারেল মিন অং হ্লাইং এর নেতৃত্বে সামরিক জান্তা সরকারের পাঁচ বছর পূরণ হতে চলেছে। ২০২১ সালে তৎকালীন বেসামরিক সরকার প্রধান অং সান সুচিকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে একদণ্ডও শান্তিতে থাকতে পারেনি জান্তা।

প্রায় এক দশক গণতন্ত্রের সুখছায়ায় থাকা মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ 'কারচুপির' অতিরঞ্জিত দায় দেখিয়ে ঘটানো ক্যু মেনে নেয়নি। শুরুতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হলে তা দমন-পীড়নের মাধ্যমে বন্ধের চেষ্টা চালায় জান্তা। কিন্তু তাতেও দমেনি গণতন্ত্রকামী জনগণ।

এরপর বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গুলো একতাবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়ে। একের পর এক শহরের দখল হারিয়ে নাস্তানাবুদ ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সেনাবাহিনী।

এক পর্যায়ে দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার দখল জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর হাত থেকে ছুটে যায়।

বিদ্রোহীদের নিরবচ্ছিন্ন হামলায় পিছু হটতে বাধ্য হয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কিন্তু হঠাৎ করেই আবার ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে। নবোদ্যমে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের ওপর নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে সামরিক জান্তা। এই 'ঘুরে দাঁড়ানোর' বিষয়টি নিয়ে চলে ব্যাপক আলোচনা। 

পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের জান্তার কাছে অস্ত্র ও তেল সরবরাহের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করলেও কোনো এক অলৌকিক উপায়ে তারা রসদ পেতে থাকে। নতুন করে আবারও বেশ কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সামরিক শাসক।

এর মাঝে নতুন এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরানের 'ভুতুড়ে জাহাজে' করে তেল আসছে মিয়ানমারে। 

রয়টার্স-অ্যামনেস্টির তদন্ত

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও রয়টার্সের এক যৌথ তদন্তে জানা গেছে, মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী জনগণ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য, উভয়ের ওপর প্রাণঘাতী বিমান হামলার তেল যোগাচ্ছে তেহরান।

মিয়ানমারের সর্বশেষ নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের সাবেক সদস্যদের নিয়ে গঠিত ছায়া-সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) -এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জান্তা দুই হাজার ৫০০টি বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় এক হাজার ৭০০ জন নিহত হন।

সামরিক জান্তার বিমান হামলায় বিধ্বস্ত স্কুল ভবন। ছবি: রয়টার্স
সামরিক জান্তার বিমান হামলায় বিধ্বস্ত স্কুল ভবন। ছবি: রয়টার্স

২০২৫ সালে আকাশপথে আসা হামলার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। গত বছর পাঁচ হাজার ৬০০ হামলায় মিয়ানমারের দুই হাজার ২০০ নাগরিক নিহত হন।

অ্যামনেস্টি বলছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল ধার নিয়েছে।

ইরান থেকে 'ভুতুড়ে জাহাজে' করে উড়োজাহাজের জ্বালানি আসছে মিয়ানমারে। এসব নৌযাত্রা চলাকালীন সময় জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ রাডার (এআইএস) বন্ধ রাখে। যার ফলে নৌযান চলাচলের আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে তাদের কোনো হদিস থাকে না।

বলাই বাহুল্য, বিষয়টি বেআইনি। তবে এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করা বেশ কঠিন।

মিয়ানমারে জ্বালানি প্রবাহের বিস্তারিত

তদন্ত প্রতিবেদন মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বেশ কয়েক দফায় মিয়ানমারে উড়োজাহাজের জ্বালানি আসার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দুইটি তেলবাহী জাহাজও আছে। গিনিতে নিবন্ধিত রিফ ও নোবেল নামের ওই দুই জাহাজ অতীতেও ইরান থেকে তেল রপ্তানির কাজে ব্যবহার হয়েছে।

বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নৌপথে জ্বালানি পরিবহনের ওপর নজর রাখার অনানুষ্ঠানিক এক প্ল্যাটফর্ম কেপ্লার। প্রতিষ্ঠাতারা একে 'তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য বুদ্ধিমত্তা' প্ল্যাটফর্ম আখ্যা দেন।

কেপ্লারের দেওয়া স্যাটেলাইট ছবি ও ডাটার ওপর ভিত্তি করে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, ওই দুই জাহাজে করে আসা সব পণ্য ইরান থেকে পাঠানো হয়েছে।

মিয়ানমারে ইয়ানগনের থিলাওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বন্দরে তেল খালাস করা হচ্ছে। ছবি: সরকারি ওয়েবসাইট
মিয়ানমারে ইয়ানগনের থিলাওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বন্দরে তেল খালাস করা হচ্ছে। ছবি: সরকারি ওয়েবসাইট

২০২৪ সালের অক্টোবর, ২০২৫ সালের জুলাই ও অক্টোবরে মোট তিনবার মিয়ানমারে জ্বালানি নিয়ে আসে রিফ নামের জাহাজটি। অপরদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নোবেল নামের জাহাজটি চারটি চালান নিয়ে আসে।

অ্যামনেস্টি ও রয়টার্সের যৌথ তদন্তে আরও জানানো হয়, ওই জাহাজগুলো ইরানের হরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। এরপর সেই জ্বালানি নিয়ে ইয়ানগনের কাছাকাছি মায়ান তেল টার্মিনালে পণ্য খালাস করে জাহাজগুলো।

কিন্তু এই যাত্রাপথের পুরোটা সময় 'ভুয়া অবস্থান' দেখায় জাহাজগুলো।

ইরানের ঐ বন্দরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির অভিজাত সেনাদল বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি)।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে তথ্য সরবরাহ করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্স। বার্তা সংস্থাটির তদন্তে জানা গেছে, রিফ ও নোবেল ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নয় দফায় মোট এক লাখ ৭৫ হাজার টন উড়োজাহাজের জ্বালানি মিয়ানমারের জান্তাকে সরবরাহ করেছে।

অ্যামনেস্টির দাবি, চীনের পতাকাবাহী হুইতং ৭৮ নামের জাহাজটি ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ১০ দফায় জান্তাকে জ্বালানি সরবরাহ করেছে।

২০২৪ সালের ১২ জুলাই-এর চালানটি সিনম্যাক্সের নজরে আসে। তাদের দাবি, সে যাত্রায় এআইএস রাডার বন্ধ রাখে জাহাজটি।

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দ্বিগুণের বেশিবার বিমান হামলা চালায় সামরিক জান্তা। ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দ্বিগুণের বেশিবার বিমান হামলা চালায় সামরিক জান্তা। ছবি: সংগৃহীত

খুব সম্ভবত ওই জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলের গভীর সমুদ্রে স্থাপিত জেটিতে জ্বালানি সরবরাহ করে। সেখান থেকে পরবর্তীতে অন্য কোনো উপায়ে মিয়ানমারে জ্বালানি পাঠানো হয়।

চীনের পতাকাবাহী অপর জাহাজ ইয়ং শেং ৫৬ (পরবর্তীতে নাম বদলিয়ে এলএস মার্কারি রাখা হয়) ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরা থেকে মিয়ানমারে জ্বালানি সরবরাহ করে বলে অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি।

মিয়ানমারের বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, শুধু ২০২৫ সালেই এক লাখ নয় হাজার ৬০৪ টন উড়োজাহাজের জ্বালানি আমদানি করেছে মিয়ানমার।

এই সংখ্যাটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। 

নিষেধাজ্ঞাকে 'কাঁচকলা' দেখাচ্ছে জান্তা

ভ্লাদিমির পুতিন, কিম জং উন ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে নিজেকে এক কাতারে নিয়ে এসেছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। ওই তিন নেতার মতো তিনিও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করে যাচ্ছেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অ্যামনেস্টির আঞ্চলিক গবেষণা পরিচালক মন্তসে ফেরের-এর মন্তব্যে বিষয়টি খোলাসা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'ক্যুর পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে, মিয়ানমারের জান্তা এখনো বিধিনিষেধ এড়াচ্ছে এবং উড়োজাহাজের জ্বালানি আমদানির নিত্য-নতুন পন্থা খুঁজে পাচ্ছে। ওই জ্বালানির ব্যবহারে তারা তাদের নিজেদের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে। ২০২১ সালে জান্তা ক্ষমতা দখলের পর ২০২৫ সালে বিমান হামলায় সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।'

তিনি বলেন, 'যেসব সরকার ও প্রতিষ্ঠান এই বেপরোয়া সরবরাহ শৃঙ্খলে ইন্ধন যোগাচ্ছে, তাদেরকে থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও উদ্যোগী হতে হবে। যতদিন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত প্রাণের বিনিময়ে সেই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে', যোগ করেন তিনি।

এনইউজি'র মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের মতে, জান্তা ২০২৫ সালে বেসামরিক স্থাপনার ওপর পাঁচ হাজার ৬০৮ বার বিমান হামলা চালায়। এর মধ্যে ৬১৭টি উপাসনালয়, ধর্মীয় স্থাপনা, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে।

এসব হামলায় দুই হাজার ১৮১ জনের প্রাণহানি হয় এবং অপর চার হাজার ৩১০ জন আহত হন।

জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বিমানবাহিনীর একটি জেট সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স
জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বিমানবাহিনীর একটি জেট সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

২০২৪ সালে হামলা-প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় অর্ধেক ছিল।

ওই বছর দুই হাজার ৪৭১ হামলায় এক হাজার ৭৩১ জন নিহত ও তিন হাজার ২৬০ জন আহত হয়।