ব্রিকসের বিবর্তন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহনে নানা ধরনের বাধার মধ্যে আজ শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বার্ষিক সম্মেলনে বসছে ব্রিকস জোটের নেতারা।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সম্প্রসারিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই জোট গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তবে সদস্যদেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে ঐকমত্যে পৌঁছানো এখন জোটটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

যেভাবে যাত্রা শুরু

‘বিআরআইসি’ বা ‘ব্রিক’ শব্দটি ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের তৎকালীন প্রধান অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিলের একটি গবেষণাপত্রে প্রথম ব্যবহার করা হয়। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সংক্ষিপ্ত নাম। তবে দেশ চারটি ২০০৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি জোট হিসেবে একত্রিত হয়।

২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর জোটটির নাম হয় ব্রিকস (বিআরআইসিএস)।

২০২৪ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সদস্য হলে জোটটির পরিসর আরও বাড়ে। ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়াও এতে যোগ দেয়। সৌদি আরবকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা গ্রহণ করেনি।

ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে রাজস্থানের পুষ্করের মরুভূমিতে বালুর ভাস্কর্য তৈরি করছেন ভারতীয় শিল্পী অজয় রাওয়াত। ছবি: এএফপি

কেন গঠিত হয়েছিল ব্রিকস

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রভাবাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে জোটের সদস্যদেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

ব্রিকসের বর্তমান কার্যক্রম মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা এবং সদস্যদেশগুলোর জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। প্রতি বছর সদস্যদেশগুলোর শীর্ষ নেতারা সম্মেলনে বসেন এবং পালাক্রমে বিভিন্ন দেশ জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

ব্রিকসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের লক্ষ্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা।

ব্যাংকটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ১৩৯টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর দেশটিতে নতুন লেনদেন স্থগিত করেছে ব্যাংকটি।

ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতেও ব্রিকস সদস্যরা উদ্যোগ নিচ্ছে। সদস্যদেশগুলোর দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে সীমান্তপারের লেনদেন সহজ করতে ‘ব্রিকস পে’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।

এ ছাড়া, সদস্যদেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ডলারের বিকল্প হিসেবে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর চেষ্টা করছে জোটের সদস্যরা।

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ভেন্যু ভারত মণ্ডপমের সামনে দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ছবি: রয়টার্স

ঐকমত্যই বড় চ্যালেঞ্জ

ব্রিকসের সম্প্রসারণ যেমন জোটটির প্রভাব বাড়িয়েছে, তেমনি এর মধ্যে মতপার্থক্যও বাড়িয়েছে। জোটটির মূল লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্য মোকাবিলায় একটি পাল্টা শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিল জোটটির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে।

২০২৪ সালের সম্প্রসারণের পর সদস্যদের পররাষ্ট্রনীতিগত অবস্থানের বৈচিত্র্য আরও বেড়েছে। ফলে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

নয়াদিল্লির এবারের সম্মেলনে এই মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। এই দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারত। গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও একই ধরনের মতবিরোধের কারণে যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।

পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে ব্রিকস

পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণত ব্রিকসকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। তাদের দৃষ্টিতে, জোটটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য ব্রিকসের সঙ্গে একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়েছেন এবং জোটটিকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ব্রিকস নতুন কোনো মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নিলে বা মার্কিন ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রাকে সমর্থন করলে সদস্যদেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

গত বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ব্রাজিল একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর ধারণা সামনে এনেছিল। তবে পরে সেই প্রস্তাব বাতিল করা হয়।

এবারের সম্মেলনে তাই ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য কাটিয়ে কতটা কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ জোট হিসেবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।