ফ্লোটিলার অধিকারকর্মীদের হেনস্তা, বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী নৌবহর আটক করার পর তাতে থাকা ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীদের সঙ্গে ইসরায়েল যে আচরণ করেছে, বিশ্বজুড়ে তার তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির একটি ভিডিও পোস্ট করার পর এই নিন্দার ঝড় ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা অধিকারকর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে বেন-গভির তাদের বিদ্রূপ করছেন।

তার এই কর্মকাণ্ডের ফলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছ থেকেও বিরল সমালোচনা এসেছে। নেতানিয়াহু বলেন, বেন-গভিরের এই আচরণ ‘ইসরায়েলের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

এদিকে, ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ বা এই ত্রাণবহরে অংশ নেওয়া ৪০টিরও বেশি দেশের ৪৩০ জন সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী একটি মানবাধিকার গোষ্ঠী আটকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছে।

প্রতীকী ত্রাণ নিয়ে নৌবহরটি যাত্রা করেছিল মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফিলিস্তিনিদের মানবেতর পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর নজরে আনার জন্য। তবে ইসরায়েল একে ‘হামাসের পক্ষে প্রচারণামূলক নাটক’ হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত বৃহস্পতিবার তুরস্ক থেকে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র (জিএসএফ) ৫০টিরও বেশি নৌযান যাত্রা শুরু করে। সোমবার সকালে সাইপ্রাসের পশ্চিমে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সশস্ত্র ইসরায়েলি নৌ-কমান্ডোরা এই নৌবহরের পথরোধ শুরু করে। এলাকাটি ইসরায়েলি নৌ-অবরোধের অধীনে থাকা গাজা উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল (৪৬০ কিমি) দূরে অবস্থিত।

জিএসএফের আয়োজকরা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে সবগুলো নৌযান আটক করা হয়। তবে একটি নৌকা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ৮০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।

তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবৈধ আগ্রাসনের’ অভিযোগ তুলে জানান, ইসরায়েলি কমান্ডোরা ছয়টি নৌকায় গুলি ছুড়েছে, জলকামান ব্যবহার করেছে এবং একটি নৌযানকে ইচ্ছাকৃতভাবে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে।

তবে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, গাজার ওপর আরোপিত ‘বৈধ নৌ-অবরোধ’ লঙ্ঘনের কোনো প্রচেষ্টাই তারা বরদাশত করবে না।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব অধিকারকর্মীকে ইসরায়েলি জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ইসরায়েলে পৌঁছানোর পর তাদের নিজ নিজ দেশের কনস্যুলার বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে।

তবে বুধবার সকালে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘আদালাহ’ জানায়, এই অধিকারকর্মীদের ‘সম্পূর্ণভাবে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে নিয়ে আসা হচ্ছে’ এবং বর্তমানে তাদের আশদোদ বন্দরে আটকে রাখা হয়েছে।

বিকেলের দিকে, ইসরায়েলের কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বে থাকা জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন।

‘ওয়েলকাম টু ইসরায়েল’ শিরোনামের ওই ভিডিওতে তাকে আশদোদ বন্দরের বন্দিশালা পরিদর্শন করতে দেখা যায়, যেখানে অধিকারকর্মীদের আটকে রাখা হয়েছে।

ভিডিওর একপর্যায়ে দেখা যায়, এক নারী অধিকারকর্মী ‘ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে চিৎকার করলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে জোর করে মাটিতে চেপে ধরছে এবং বেন-গভির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের উৎসাহিত করছেন।

এরপর বেন-গভিরকে দেখা যায় হাত বাঁধা অবস্থায় মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ডজনখানেক কর্মীর পাশে একটি বড় ইসরায়েলি পতাকা ওড়াতে। হিব্রু ভাষায় তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ইসরায়েলে স্বাগতম। আমরাই এখানকার হর্তাকর্তা।’

ভিডিওর অন্য অংশে দেখা যায়, জাহাজের ডেকে অধিকারকর্মীদের হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং সেখানে ইসরায়েলের জাতীয় সংগীত বাজানো হচ্ছে।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বেন-গ্যভীরের এই কর্মকাণ্ডকে ‘ঘৃণ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার ভিডিওতে প্রদর্শিত দৃশ্যগুলোকে ‘সম্পূর্ণ লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে ‘জরুরি ব্যাখ্যা’ তলব করতে তিনি ইসরায়েলি দূতাবাসে সমন পাঠিয়েছেন। 

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অধিকারকর্মীদের প্রতি ইসরায়েলের এই আচরণকে ‘জঘন্য’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং বেন-গভিরের প্রতি নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের এই আচরণ ছিল ‘মর্যাদাহানিকর’।

এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং স্পেন বেন-গভিরের কর্মকাণ্ডকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং প্রত্যেকেই তাদের দেশে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।

আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকেন্টি বলেন, ভিডিওতে দেখা গেছে আয়ারল্যান্ডের নাগরিকসহ ‘বেআইনিভাবে আটক অন্যদের’ কোনোভাবেই যথাযথ মর্যাদা বা সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি।

এক নজিরবিহীন পদক্ষেপে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই তার মন্ত্রিসভার সহকর্মীর (বেন-গভিরের) সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার এক্সে লেখেন, ‘আপনি জেনেশুনেই আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছেন—এবং এটিই প্রথমবার নয়।’

বেন-গভিরও দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বোঝা উচিত যে, ইসরায়েল এখন আর কারো চোখরাঙানি সইবে না।'

এরপর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই বেন-গভীরকে তিরস্কার করেন।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা (জিএসএফ) জানায়, তাদের নৌবহরে গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য, শিশুখাদ্য এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল। সেখানে জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত শোচনীয় এবং গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ২১ লাখ জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষই বর্তমানে বাস্তুচ্যুত।

তবে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, গাজায় বর্তমানে ‘ত্রাণ উপচে পড়ছে’। তাদের মতে, গত সাত মাসে ১৫ লাখ টনের বেশি ত্রাণ এবং হাজার হাজার টন চিকিৎসা সরঞ্জাম সেখানে প্রবেশ করেছে।

বিপরীতে জাতিসংঘ গত সপ্তাহে জানিয়েছে, সেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলো এখনও সীমিত; বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ অনিয়মিত এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে। এ ছাড়া পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘ আরও বলেছে যে, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, ব্যাক-আপ জেনারেটর এবং অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতে বিধিনিষেধের কারণে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি ও ইঞ্জিন অয়েলের মতো জরুরি উপকরণেরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলার মাধ্যমে গাজা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে এ পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।