এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্প-পুতিনের টানাটানি, ইউরেনিয়াম হাতছাড়া করবে ইরান?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় যাবে—এই প্রশ্ন এখন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তেহরানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাব দিয়েছেন, মস্কো ইরানের ইউরেনিয়াম নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে প্রস্তুত।

রয়টার্স বলছে, এই দুই নেতার প্রস্তাবের ভেতরে লুকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো কেমন হবে তার উত্তর।

বিমান হামলার পর ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রের স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স

ইরানের ইউরেনিয়াম কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের হাতে বর্তমানে শত শত কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। এই ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ। এই ইউরেনিয়াম আর কিছুটা সমৃদ্ধ করে বোমা তৈরি করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মজুতই এখন ইরানকে ‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি অবস্থানে’ রেখেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ-এর সময়ও ইরানের ইউরেনিয়াম বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তখন রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এবারও পুতিন সেই ‘অভিজ্ঞতা পুনরাবৃত্তি’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

কিন্তু এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান ধীরে ধীরে নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়েছে।

ইরানের ফোরদো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরের স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স 

ট্রাম্প আসলে কী চান?

তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে আছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, ইরানের ইউরেনিয়াম যদি রাশিয়ায় যায়, তাহলে সেটি শেষ পর্যন্ত আবার ইরানের হাতেই ফিরে আসতে পারে। রাশিয়া নিজের স্বার্থে সেটিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরানের ইউরেনিয়াম তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আসুক।

ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়াম পাবে।’ তারা একে শুধু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয় হিসেবে দেখছে না। এর মাধ্যমে তারা ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য তিনটি—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ভেঙে দেওয়া, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করা।

কিন্তু এখানেই মূল সংকট। তেহরানের কাছে ইউরেনিয়াম শুধু প্রযুক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক। ফলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইউরেনিয়াম তুলে দেওয়া ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।

পুতিনের প্রস্তাব কেন আলাদা?

আপাতদৃষ্টিতে রাশিয়ার প্রস্তাব তুলনামূলক ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে হতে পারে। কারণ মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া ও ইরান আরও কাছাকাছি এসেছে।

পুতিনের যুক্তি হলো, ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় রাখলে একদিকে যেমন ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমবে, অন্যদিকে তেহরানও পুরোপুরি ‘অপমানিত’ বোধ করবে না। কারণ সেটি শত্রু রাষ্ট্রের হাতে নয়, বরং একটি মিত্র দেশেই থাকবে।

রাশিয়ার এই প্রস্তাবের আরেকটি কৌশলগত দিকও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিজেদের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া এখনও প্রভাব ধরে রাখতে চায়। ইরানের ইউরেনিয়াম নিজেদের ভূখণ্ডে নেওয়া গেলে সেই প্রভাব আরও বাড়বে।

ইরানের জন্য কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য?

ইরানের ভেতরে এ নিয়ে বড় ধরনের দ্বিধা রয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থীরা মনে করে, ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো মানেই আত্মসমর্পণ। আবার বাস্তববাদীরা মনে করে, অর্থনীতি বাঁচাতে এবং যুদ্ধ এড়াতে একটি সমঝোতা প্রয়োজন।

তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ইরান কখনোই ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে চাইবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকেই তারা প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির ওপরও তেহরানের আস্থা নেই।

অন্যদিকে রাশিয়ায় ইউরেনিয়াম পাঠানোর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু সেখানেও ঝুঁকি আছে। কারণ ইরান জানে, মস্কো শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থই দেখবে। দরকার হলে রাশিয়াও ইরানের ইউরেনিয়ামের বিষয়টি পশ্চিমাদের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

২০২১ সালে ইরানের পরমাণু শক্তি দিবসে প্রদর্শন করা সেন্ট্রিফিউজ। এগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে ব্যবহার করা হয়। ছবি: রয়টার্স

আড়ালে বড় কোনো সমঝোতা হচ্ছে?

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সীমিত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সেখানে ইউরেনিয়াম বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নটি ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, আলোচনায় ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে কাজ চলছিল। সেখানে ইরান কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে পারে—এমন ইঙ্গিত ছিল। তবে মজুত ইউরেনিয়াম কোথায় যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে কঠোর ভাষাও ব্যবহার করছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার সামরিক হামলা হতে পারে।

ফলে ইরানের সামনে এখন মূলত তিনটি পথ খোলা—ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে সীমিত সমঝোতায় যাওয়া, আংশিক সমঝোতার মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করা এবং কোনো ছাড় না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া।

ইসরায়েল সব সময়ই বলে এসেছে ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠলে তাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। কোনো পরিস্থিতিতেই তারা এটা হতে দিতে চায় না। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোও চায় না ইরান পারমাণবিক ক্ষমতাধর হোক।

অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া চায় না, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে এটা ফয়সালা করুক। ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম প্রশ্নটি এখন নতুন ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে যায়, তাহলে সেটি হবে ওয়াশিংটনের বড় বিজয়। আর যদি রাশিয়ায় যায়, তাহলে মস্কো প্রমাণ করতে পারবে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে এখনও তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরান শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ তেহরানের দৃষ্টিতে এটি শুধু প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়; এটি তাদের টিকে থাকা, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যেরও প্রশ্ন।