ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের বিস্তারিত জানতে মার্কিন কংগ্রেসে বিরল উদ্যোগ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তারা বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে স্পষ্টতা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

ধারণা করা হয়, ইসরায়েল ১৯৬০-এর দশক থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। তবে দেশটি বরাবরই ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। অর্থাৎ তারা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বা অস্ত্রভান্ডারের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, হোয়াইট হাউসও দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে, যদিও মাঝে মধ্যে কিছু পরোক্ষ স্বীকারোক্তি এসেছে।

সম্প্রতি ৩০ জন কংগ্রেস সদস্যের সই করা চিঠিতে বলা হয়, ‘মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক ভারসাম্য, এই সংঘাতে যেকোনো পক্ষের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত থাকার সাংবিধানিক অধিকার কংগ্রেসের রয়েছে।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘এক পক্ষের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সরকারি অস্পষ্টতা মধ্যপ্রাচ্যে সুসংহত পরমাণু বিস্তাররোধ নীতি কার্যত অসম্ভব করে তুলছে—ইরান, সৌদি আরব এবং এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্যও।’

শিমন পেরেজ নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

চিঠিতে কী জানতে চাওয়া হয়েছে?

গত ৪ মের ওই চিঠিতে আইনপ্রণেতারা সরাসরি জানতে চান, ইসরায়েলের কাছে কী ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে এবং তাদের ওয়ারহেড ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ কী।

বিশেষভাবে তারা নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার বা ডিমোনা স্থাপনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তোলেন, যেটিকে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল কেন্দ্র বলে মনে করা হয়।

চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়, ইসরায়েলের বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা আছে কি না এবং থাকলে কোন মাত্রায়। পাশাপাশি বিভাজ্য পদার্থ ও প্লুটোনিয়াম উৎপাদন সম্পর্কেও তথ্য চাওয়া হয়েছে।

আইনপ্রণেতারা আরও প্রশ্ন তোলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই না করা ইসরায়েল বর্তমান ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ‘পারমাণবিক নীতি, লালরেখা বা অস্ত্র ব্যবহারের সীমা’ সম্পর্কে জানিয়েছে কি না।

এ ছাড়াও তারা জানতে চান, ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না—এমন কোনো নিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে কি না এবং সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত বা অন্য কোনো যুদ্ধে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বা ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল কি না।

ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যা জানা যায়

দশকের পর দশক ধরে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, ইসরায়েলি হুইসেলব্লোয়ার এবং অবমুক্ত মার্কিন গোয়েন্দা নথি ইসরায়েলের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে নানা তথ্য সামনে এনেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে সিআইএ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনকে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে বা তা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। পরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন নাকি তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। সেখানে ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার প্রকাশ বা পরীক্ষা না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, বিনিময়ে ওয়াশিংটন তদারকির চাপ কমিয়ে আনে।

ইসরায়েলি পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ ও হুইসেলব্লোয়ার মোরডেকাই ভানুনু যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকার কাছে ডিমোনা কেন্দ্রের তথ্য ফাঁস করেছিলেন।

চিঠিতে আইনপ্রণেতারা উল্লেখ করেন, ‘সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য ধারাবাহিকভাবে এই উপসংহারকে সমর্থন করে যে, ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।’

নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড, ৭৫০ থেকে ১ হাজার ১১০ কেজি প্লুটোনিয়াম মজুত, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ছয়টি সাবমেরিন এবং ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠি?

এর আগে পৃথকভাবে কিছু আইনপ্রণেতা ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি তুলেছিলেন। তবে কংগ্রেস থেকে সমন্বিতভাবে প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের ওপর এমন চাপ খুবই বিরল।

গাজায় চলমান গণহত্যা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও দুই দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখাই তাদের যুদ্ধনীতির অন্যতম লক্ষ্য। যদিও তেহরান বরাবরই এমন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা অস্বীকার করে আসছে।

ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং পলিসি প্রজেক্টের পরিচালক জোশ রুবনার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কংগ্রেস সদস্যরা ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন—ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন কেন ছাড় পাবে, অথচ আমরা ইরানকে এমন অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে চাইছি।’