যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: পাকিস্তানি সূত্র
উপসাগরীয় যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের খুব কাছাকাছি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রয়টার্স বলছে, এই আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানের একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সঠিক। অ্যাক্সিওস দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরও দুই সূত্রের বরাতে খবরটি প্রকাশ করেছিল।
পাকিস্তানি সূত্রটি জানায়, ‘খুব দ্রুতই আমরা এটি শেষ করব। আমরা সমঝোতার খুব কাছাকাছি’।
গত মাসে পাকিস্তানই যুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত একমাত্র শান্তি আলোচনা আয়োজন করেছিল এবং এরপরও তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে নেমে গেছে। একইসঙ্গে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি এবং বন্ডের সুদহারও কমে গেছে।
হোয়াইট হাউস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং রয়টার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সিএনবিসি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। এই প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে শুরু করা তিন দিনের নৌ-মিশন স্থগিত করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিতে সম্মত হবে, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং জব্দ করা ইরানি তহবিলের কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের বিধিনিষেধও উভয় পক্ষ তুলে নেবে।
অ্যাক্সিওস জানায়, ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এবং কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার মধ্যে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলছে।
বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, স্মারকে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনার সূচনা থাকবে। ওই আলোচনায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই ৩০ দিনের সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের আরোপিত বিধিনিষেধ এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে শিথিল করা হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় অবরোধ বা সামরিক অভিযান শুরু করতে পারবে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
এর আগে ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি মিশন স্থগিতের ঘোষণা দেন। রোববার ঘোষিত ওই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু এ উদ্যোগ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয় এবং উল্টো ইরানের নতুন হামলার আশঙ্কা তৈরি করে।
সর্বশেষ ঘটনায় বুধবার একটি ফরাসি শিপিং কোম্পানি জানায়, তাদের একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ আগের দিন প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে এবং আহত নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মিশন স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে লেখেন, ‘আলোচনায় বড় অগ্রগতি হয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে যে অবরোধ বহাল থাকলেও, চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরের সম্ভাবনা যাচাই করতে “প্রজেক্ট ফ্রিডম” সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরান কার্যত নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। পরে এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আলাদা অবরোধ আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ বোধ করাতে ব্যর্থ হয়। একই সময়ে ইরান নতুন করে হামলা চালায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের বিস্তীর্ণ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
এই সময় ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে একটি দক্ষিণ কোরীয় কার্গো জাহাজের ইঞ্জিনকক্ষে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে প্রণালির বাইরের উপকূলে অবস্থিত দেশটির প্রধান তেলবন্দরও ছিল, যেখান দিয়ে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে কিছু রপ্তানি কার্যক্রম চলছিল।
