ইরানের ইউরেনিয়াম দখল কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি দখলের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন, এ ধরনের অভিযান হতে পারে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপগুলোর একটি, যেখানে ‘অসংখ্য ভুল হতে পারে’।
বিবিসির প্রতিবেদনে এর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনার পেছনের প্রেক্ষাপট
মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু বিমান হামলা নয়, সরাসরি ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার দখল বা ধ্বংসের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই ইউরেনিয়াম গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষিত এবং তা দখল করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
‘সবচেয়ে জটিল’ সামরিক অভিযান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ইউরেনিয়াম দখল করতে হলে স্থলবাহিনী মোতায়েন করা ছাড়া উপায় নেই।
এটি কয়েক ঘণ্টার অভিযান নয়, বরং কয়েক দিন বা সপ্তাহব্যাপী চলতে পারে। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মিক মুলরয় এটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল বিশেষ সামরিক অভিযানের একটি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এই অভিযানে একসঙ্গে বিশেষ বাহিনী, প্রকৌশলী, গোয়েন্দা দল ও পারমাণবিক উপাদান পরিচালনায় প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে হবে।
ইরানের ইউরেনিয়াম কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো, ইরানের ইউরেনিয়াম ঠিক কোথায় এবং কত পরিমাণে সংরক্ষিত, তা পুরোপুরি নিশ্চিত না থাকা।
ধারণা করা হয়, ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো—এই তিন প্রধান স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে কতটা কোথায় রাখা আছে, তা স্পষ্ট নয়।
যদি ইউরেনিয়াম একাধিক স্থানে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি স্থানে আলাদা করে অভিযান চালাতে হবে, যা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও ভৌত বাধা
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সাধারণ স্থাপনা নয়, অনেকগুলোই গভীর ভূগর্ভে নির্মিত।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কিছু স্থাপনার প্রবেশপথ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বা বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ভেতরে ঢুকতে হলে খননযন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে।
এর অর্থ, অভিযান চলাকালে মার্কিন সেনাদের দীর্ঘ সময় উন্মুক্ত অবস্থায় থাকতে হবে, যা তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
স্থলযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযান চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালাতে হবে, যা সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে।
ইসফাহানের মতো স্থাপনাগুলো ইরানের ভেতরে অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে সেখানে যেই সেনাদের মোতায়েন করা হবে, তারা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে চিকিৎসা সহায়তা, স্থানান্তর এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে উঠবে।
একইসঙ্গে, ইরানের পাল্টা হামলা বা বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রের ঝুঁকিও থাকবে।
ইউরেনিয়াম নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ
যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল, যা দ্রুত অস্ত্রমানের (৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ) পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব। এ ছাড়া, আরও হাজার হাজার কেজি কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
এই ইউরেনিয়াম গ্যাসীয় (ইউএফ৬) আকারে বড় ধাতব কনটেইনারে সংরক্ষিত থাকে। এগুলো নিরাপদে খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ করা এবং পরিবহন করা অত্যন্ত জটিল কাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরিয়ে নেওয়া কিংবা ঘটনাস্থলেই নিষ্ক্রিয় করা, দুটিই বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
অপসারণ নাকি সেখানেই নিষ্ক্রিয়?
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বিকল্প থাকতে পারে, যেমন: ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ঘটনাস্থলেই তা নিষ্ক্রিয় করা।
তবে ঘটনাস্থলেই নিষ্ক্রিয় করতে হলে দীর্ঘ সময় ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হলেও সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
‘এক মিলিয়ন সমস্যা’
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললেও, বাস্তবে অসংখ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, আধা টনের মতো অস্ত্রমানের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম একটি শত্রু দেশের গভীর ভূখণ্ড থেকে সরিয়ে আনা এমন একটি কাজ, যেখানে ‘এক মিলিয়ন সমস্যা’ দেখা দিতে পারে।
ইরানের ইউরেনিয়াম দখলের পরিকল্পনা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা, গোয়েন্দা অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাই সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর ও নিরাপদ হতে পারে।