ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতবে, ব্রাজিলের হবে ভরাডুবি: অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস
রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এবার স্পেনকে হারিয়ে ফ্রান্স বিশ্বকাপ ট্রফি জিতবে। আর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের পারফরম্যান্স সবচেয়ে হতাশাজনক হতে পারে। তবে তারা মজা করে এও বলেছেন, বর্তমান বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়া বা কমার (মুদ্রাস্ফীতি) হিসাব করা যত কঠিন, ফুটবলের ভবিষ্যৎবাণী করা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।
বিশ্বজুড়ে ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের জন্য প্রতি চার বছরে একবার করা এই জরিপটি ছিল কাজের মাঝে একটু বিরতির মতো। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চিন্তার বাইরে গিয়ে তারা এই ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন।
এবার তাদের আলোচনার বিষয় ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন দেশে যৌথভাবে ১০৪টি ম্যাচ খেলবে মোট ৪৮টি দল।
১১ মে থেকে ৫ জুনের মধ্যে করা এই জরিপে দেখা গেছে, ৩৫% মানুষ বাজি ধরেছেন ফ্রান্সের পক্ষে। তারা মনে করছেন, ফ্রান্স এবার তাদের জার্সিতে তৃতীয় তারকা যোগ করবে। আর ৩১% ভোট পেয়ে সামান্য পিছিয়ে আছে স্পেন। এই পূর্বাভাস হুবহু মিলে যায় বিভিন্ন বাজি ধরার ওয়েবসাইটের সঙ্গে। এই ফল সত্যি হলে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব আবার ইউরোপের হাতেই থাকবে।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম যদি এবার জিতেন, তবে ১৯৩৮ সালে ইতালির ভিত্তোরিও পোজোর পর তিনি হবেন প্রথম কোচ যিনি দুটি বিশ্বকাপ জিতবেন। একই সঙ্গে ১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার পর কোচ হিসেবে এই কীর্তি গড়া একমাত্র ব্যক্তি হবেন তিনি।
জরিপে শীর্ষ পাঁচের বাকি দলগুলো হলো—বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ড।
লন্ডনের একজন সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি বলেন, ‘২০২২ সালের ফাইনালে হারার পর, ফ্রান্স এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খুব ভালো দল গড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এখন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন। এর সঙ্গে পিএসজি ক্লাবের কিছু দারুণ তরুণ খেলোয়াড় যুক্ত হয়েছেন।’
‘সবচেয়ে বড় কথা, তারা টুর্নামেন্টে একজন সতেজ ও ফুরফুরে কিলিয়ান এমবাপেকে সঙ্গে পাবে।’
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আরেকটি দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো এমবাপে এই জরিপে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট)—দুই পুরস্কারেরই প্রধান দাবিদার।
তিনি ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে সামান্য ব্যবধানে পেছনে ফেলেছেন। কেইন বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ক্যারিয়ারের সেরা ৬১ গোল করে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন।
এই বিশ্বকাপে দুজনের সামনেই নতুন রেকর্ড গড়ার সুযোগ আছে।
বিশ্বকাপে এমবাপের গোল ১২টি আর কেইনের ৮টি। তারা দুজনেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজার সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডটি ভাঙার লড়াইয়ে আছেন। আর ১৩ গোল নিয়ে লিওনেল মেসিও এই দৌড়ে আছেন।
মনের অনুভূতি
জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ২% জাপানকে, ১% মেক্সিকোকে এবং ১% মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এমন কিছু হলে তা হবে রূপকথার মতো। ৮% মানুষ জানিয়েছেন, নিজের পছন্দের দলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা এই ভোট দিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ মানুষই (৭৩%) বলেছেন, তারা কোনো হিসাব না করে স্রেফ মনের অনুভূতির ওপর ভরসা করেছেন।
জোহানেসবার্গের অর্থনীতিবিদ শ্যানন বোল্ড রসিকতা করে বলেন, ‘আমরা যত হিসাব-নিকাশই করি না কেন, শেষ পর্যন্ত মনের ইচ্ছাকেই বড় করে দেখেছি!’
অবশ্য প্রায় ২০% অর্থনীতিবিদ তথ্য ও গাণিতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই পূর্বাভাস দিয়েছেন।
আরএমবি (এর ক্লদিও গোভেন্ডার বলেন, ‘অর্থনীতিবিদরা সবাই একসঙ্গে বসে একটা প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা তৈরি করেছিলেন।’
তবে ব্রাজিলের ভাগ্য নিয়ে এই জরিপের ফল বেশ আশঙ্কাজনক।
এমনকি বিখ্যাত কোচ কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলের ওপর মানুষের ভরসা বাড়েনি। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করছেন, বড় দলগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই এবার সবচেয়ে বেশি হতাশ করবে। গত ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা। ব্রাজিলের পরেই আছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি।
ম্যানচেস্টার সিটির তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হাল্যান্ডের দল নরওয়ে এবার চমকে দিতে পারে। ২১% মানুষ মনে করছেন তারা চমক দেখাবে। এই তালিকায় ১৫% ভোট পেয়ে নরওয়ের পেছনে আছে জাপান।
নতুন কোন তারকা আলো ছড়াবেন, তা নিয়ে কোনো একক নাম আসেনি। উত্তরদাতারা ৪৬ জন আলাদা খেলোয়াড়ের নাম বলেছেন, তবে স্পেনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামাল এই তালিকায় সবার ওপরে আছেন।
সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার 'গোল্ডেন গ্লাভস'-এর জন্য ফ্রান্সের মাইক মেইগনান, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং স্পেনের উনাই সিমন আলোচনায় আছেন।
দামি বিশ্বকাপ
মাঠের বাইরে, আয়োজকদের জন্য লজিস্টিক বা যাতায়াত-থাকার ব্যবস্থা করা এক মস্ত বড় পরীক্ষা। লাখ লাখ ফুটবল ভক্ত উত্তর আমেরিকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু খরচপাতি নিয়ে ইতিমধ্যেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।
টিকিটের চড়া দাম, হোটেল খরচ এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতের বিমান ভাড়া দেখে ভক্তদের মনে ভয় ধরেছে যে, এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ।
মুদ্রাস্ফীতির চিন্তা থেকে তাহলে মুক্তি মিলল কই!
৬০%-এরও বেশি অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ফুটবল বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কে হবে তা বলা অসম্ভব, তার চেয়ে ২০২৬ সালে বাজারের মুদ্রাস্ফীতি কেমন থাকবে তা বলা অনেক সহজ।
তুরস্কের এক ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ওজান জান তুর্কমেন সুন্দর করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন, ‘আমরা অন্তত নিশ্চিতভাবে জানি বিশ্বকাপ কবে শেষ হবে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের মতো অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।’