মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন

ইরানের যুদ্ধকৌশল নির্ধারণে মোজতবা খামেনির ভূমিকা কতটুকু

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও যুদ্ধ ও কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে বর্তমানে অস্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র কোথায় তা স্পষ্ট না হলেও মোজতবা খামেনির ভূমিকা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনা কীভাবে পরিচালিত হবে, আড়াল থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা তার নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আজ শনিবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি মোজতবা খামেনির অবস্থান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হলে মোজতবা খামেনির বাবা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন।

ওই হামলায় গুরুতর আহত হন মোজতবা খামেনি। এরপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এরপর থেকে তার স্বাস্থ্য ও নেতৃত্ব নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।

কোথায় আছেন খামেনি

মার্কিন সূত্র বলছে, তিনি কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করছেন না। তার সঙ্গে যারা সরাসরি দেখা করতে পারছেন তাদের মাধ্যমে বা বার্তাবাহকের মাধ্যমে তিনি যোগাযোগ করছেন।

এছাড়া তিনি এখনো চিকিৎসাধীন। তার শরীরের একপাশে গুরুতর দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি মুখ, হাত, বুক ও পায়েও আঘাত রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের প্রটোকল প্রধান মাজাহের হোসেইনি গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘খামেনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার পা ও কোমরে সামান্য আঘাত ছিল। কানের পেছনে বোমার বিস্ফোরিত ছোট একটি ধাতব টুকরোর আঘাত লেগেছিল। ক্ষতগুলো এখন সেরে উঠছে।’

খামেনির সঙ্গে বৈঠকের তথ্য

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত দুই মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে কে কে দেখা করেছেন বা বৈঠক করেছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শুধু দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চলতি সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করার কথা নিশ্চিত করেন।

এটি ছিল নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে কোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার প্রথম প্রকাশিত সরাসরি বৈঠকের তথ্য।

সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে?

মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি আলোচনার কৌশলে জড়িত থাকলেও তিনি নিয়মিত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন—এমন স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানায়, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তারাই বর্তমানে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মোজতবা খামেনির সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগাযোগ করা হয়।

তবে অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, গালিবাফ নিয়মিত নির্দেশ দিচ্ছেন—এমন কোনো প্রমাণও নেই। আবার দিচ্ছেন না—এটাও বলা যাবে না।

এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ সিএনএনকে বলেন, ‘নতুন সর্বোচ্চ নেতা আলোচনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে থাকুন বা না থাকুন, বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হয়। তবে আলোচনার কৌশল নির্ধারণে তার ভূমিকা নাও থাকতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোজতবা খামেনি তার বাবার মতো নিয়মিত সামনে এসে মন্তব্য করছেন না। তাই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই মোজতবার সম্পৃক্ততাকে সামনে আনছে, যেন অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এড়ানো যায়।’

ইরানের বর্তমান আলোচকরা এ কৌশল ব্যবহার করছেন বলে মনে করেন আলি ভায়েজ।

কতদিন টিকে থাকতে পারবে ইরান

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বা লঞ্চার।

সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে এই সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, যুদ্ধবিরতি ইরানকে মাটির নিচে চাপা পড়া লঞ্চারগুলো খুঁড়ে বের করার জন্য সময় দিচ্ছে। কিছু উৎক্ষেপক ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধারও করেছে তারা।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান মার্কিন অবরোধ স্বত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি আরও চার মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে। 

তবে ভিন্ন কথাও বলছেন গোয়েন্দাদের কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ইরানের বাণিজ্য বন্ধসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে আছেন এবং সামরিক বাহিনীও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।'

ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স/রয়টার্স

তার মতে, ইরানে এখন যা বাকি আছে, তা হলো বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগ। ইতিমধ্যেই হেরে যাওয়া একটি যুদ্ধকে টেনে দীর্ঘায়িত করে নিজেদের জনগণকে অনাহারে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটির সরকার।

গালিবাফের উত্থান

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে জানতে চান, ইরানের পক্ষে এখন কারা প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখছেন।

সেই সময় অন্তত একটি উপসাগরীয় দেশ ওয়াশিংটনকে জানায়, গালিবাফই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

এরপর ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনা নেতৃত্ব দেন গালিবাফ। বর্তমানে তাকেই ইরানের অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রথম দফার বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয় এবং দ্বিতীয় দফার আলোচনা আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যা চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে বলা হয়, মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি এবং বর্তমানে বিভক্ত ইরানি শাসনব্যবস্থাই  ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সংঘাত অবসানের আলোচনার ক্ষেত্রে প্রকৃত কর্তৃত্ব এখন কার হাতে সে ব্যাপারে স্পষ্ট নয় যুক্তরাষ্ট্র।  

এ নিয়ে গতকাল শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত এবং অকার্যকর, যা আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’