হাজার বছরের সভ্যতা রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য নতুন করে বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে। ইরানকে তিনি হুমকি দিয়েছেন, সমঝোতা না হলে ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই নয়, ইতিহাস, সভ্যতা ও যুদ্ধের প্রকৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, আসলেই কি কোনো সভ্যতাকে ধ্বংস করা সম্ভব?

বর্তমানের ইরান মূলত প্রাচীন পারস্য সভ্যতার ধারাবাহিক রূপ। মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন এই সভ্যতার বয়স কয়েক হাজার বছর। আকেমেনীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সাসানীয় যুগ, এরপর ইসলামি শাসন, প্রতিটি সময়েই রাজনৈতিক কাঠামো বদলেছে, কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা অটুট থেকেছে। এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে রয়েছে ফার্সি ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক চেতনা।

পরিণতি না ভেবেই ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পারস্য বহুবার ভয়াবহ আঘাতের মুখে পড়েছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য সাম্রাজ্য দখল করেন। পার্সেপোলিসের মতো নগর ধ্বংস হয়। কিন্তু সেই ধ্বংস পারস্যের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে মুছে ফেলতে পারেনি, বরং গ্রিক ও পারস্য সংস্কৃতির মিশ্রণে নতুন এক সভ্যতার রূপ গড়ে ওঠে। সপ্তম শতকে আরব মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে পারস্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে পারস্য তার নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখে এবং ইসলামি সভ্যতার ভেতরেই নতুনভাবে বিকশিত হয়।

এরপর ত্রয়োদশ শতকে মঙ্গোল আক্রমণ পারস্যকে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। অসংখ্য নগর ধ্বংস হয়, জনসংখ্যা বিপুলভাবে কমে যায়। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ধ্বংসই শেষ কথা ছিল না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পারস্য আবার ঘুরে দাঁড়ায়, নতুন রাজনৈতিক কাঠামো, নতুন সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং জ্ঞানচর্চার পুনর্জাগরণের মাধ্যমে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই পুনর্জীবনশক্তিই পারস্য সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য।

ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিধ্বস্ত মার্কিন বিমানের ধ্বংসাবশেষ। ছবি: এএফপি

আধুনিক সময়েও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে, একটি সভ্যতা কি সামরিক শক্তি দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব? আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, হামলা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের বেধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও ইরান আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। এপি উল্লেখ করেছে, ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংস’ মন্তব্য বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বেসামরিক জনগণের জীবন ও অবকাঠামো গুরুতর ঝুঁকির মুখে। আর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এই ধরনের বক্তব্যকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের ভাষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘সভ্যতা ধ্বংস’ ধারণাটি বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। সভ্যতা বলতে কেবল স্থাপনা বা অবকাঠামো বোঝায় না, এটি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং পরিচয়ের সমষ্টি। একটি দেশের শহর ধ্বংস হতে পারে, সরকার পতন হতে পারে, কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না। ইরানের জাতিসংঘ মিশনও এক বিবৃতিতে বলেছে, সামরিক হামলার মাধ্যমে একটি সভ্যতা ধ্বংস করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের তাজমহল বলে খ্যাত ঐতিহাসিক গোলেস্তান প্রাসাদের ছবি তুলে রাখছেন এক দর্শনার্থী। ছবি: এএফপি

এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেকেই কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য উদ্বেগের কারণ। শক্ত ভাষার ব্যবহার কূটনৈতিক চাপ তৈরি করার একটি পরিচিত পদ্ধতি। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কঠোর অবস্থান প্রদর্শনের একটি প্রভাব থাকে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট। বেসামরিক জনগণ বা অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কোনো দেশের সাংস্কৃতিক বা বেসামরিক কাঠামো ধ্বংসের হুমকি বা চেষ্টা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

যুদ্ধের মধ্যেই পারস্য নববর্ষ নওরোজের ১৩তম দিন ‘সিজদেহ বেদার’ (প্রকৃতি দিবস) উপলক্ষে তেহরানের মেল্লাত পার্কে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে উৎসব করছে মানুষ। ছবি: এএফপি

ইতিহাসের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে, কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা টিকে গেছে। মঙ্গোলরা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু অঞ্চল ধ্বংস করেছে, কিন্তু সেই অঞ্চলগুলোর সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলীন হয়ে যায়নি। একইভাবে পারস্য সভ্যতাও প্রতিটি আঘাতের পর নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করা সম্ভব, একটি দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব, এমনকি একটি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোও সম্ভব। কিন্তু একটি সভ্যতা, যা মানুষের চেতনা, ভাষা ও ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।


হোয়াইট হাউসে ইরান সংঘাত নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় বন্দুক চালানোর ভঙ্গি করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

এই বাস্তবতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংস’ সংক্রান্ত মন্তব্যকে ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে এটি মূলত রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যুদ্ধ সভ্যতাকে আঘাত করতে পারে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না।