ঈদের আগে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, ফিরল ৯ লাশ

মান্দার শিবনদীর পাড়ে কান্নার রোল
মোস্তফা সবুজ
মোস্তফা সবুজ

ঈদে বাবা বাড়ি ফিরবেন। পাঁচ বছরের আশামনি ঠিক করে রেখেছিল, বাবা এলেই গলা জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই অপেক্ষা এখন নিঃশব্দ কান্না। টাঙ্গাইলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরসো ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের বাসিন্দা।

নিহতদের একজন মোহাম্মদ বাদশা মিয়া (২৮)। তার স্ত্রী সাবিনা প্রামানিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে মেয়ে শুধু বাবার কথা বলতেছে। বলত, বাবা আইলে গলা ধইরা থাকব।’

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার জাহান সাথী নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সুলতানের ছেলে মোহাম্মদ তারেক (২১), আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল বারেক (২৪), আব্দুর রহিমের ছেলে মোহাম্মদ বাদশা মিয়া (২৮), একাব্বরের ছেলে সোহাগ (২১), সাকিমের ছেলে সাগর (২২) ও শহিদুলের ছেলে রবিউল (২৬) রয়েছেন।

পাশের পাকুড়িয়া গ্রামের দুই সহোদর মাইনুল (২৭) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মুর্শিদপুর গ্রামের মইনুর ইসলামও (৩০) নিহত হয়েছেন।

ঈদ সামনে রেখে পরিবারগুলোর ছিল একইরকম স্বপ্ন। কেউ নতুন কাপড় কিনবেন, কেউ ঘরের ঋণ শোধ করবেন, কেউ সন্তানকে নিয়ে ঈদের বাজারে যাবেন। কিন্তু সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে গেছে।

রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের আশরাফুল মণ্ডল বলেন, ‘এই গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবারের পুরুষেরা সাইকেল নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ফেরি করে। প্লাস্টিকের জিনিস, বাটি, কানের দুল, সিলভারের তৈজসপত্র বিক্রি করে সংসার চলে।’

শিবনদীর তীরে গড়ে ওঠা এই গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার বংশপরম্পরায় মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। বর্ষার কয়েক মাস নদী ও বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা চলে। বছরের বাকি সময় জীবিকার টানে পুরুষেরা ছড়িয়ে পড়েন দেশের বিভিন্ন জেলায়।

আব্দুল খলিল বলেন, ‘গ্রামে কাজ নাই। তাই নোয়াখালী, ফেনীসহ বিভিন্ন জায়গায় ফেরি করতে যাই। কেউ চুলও সংগ্রহ করে বিক্রি করে পরচুলার কারখানায়।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহতরা কয়েকদিন আগে নোয়াখালী ও ফেনীতে ফেরি করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই একসঙ্গে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।

নিহত আব্দুল বারেকের মা ময়না হাহাকার জড়ানো কণ্ঠে বলেন, ‘বাড়ি করতে ব্যাংক আর এনজিও থেকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ নিছি। ছেলে কিস্তি দিত। গতকাল দুপুরে ফোন দিছিল। কইল, মা, বেচাবিক্রি ভালো না, লোকসান হইতেছে। বাড়ি যামু, কিন্তু টাকা নাই। আমি কইলাম, ধার কইরা বাড়ি আয় বাবা। সেই ধার করা টাকায় ট্রাকে উঠছিল, কিন্তু আর ফিরল না।’

নিহত সোহাগের চাচাতো ভাই আশরাফুল মণ্ডল বলেন, ‘সোহাগ মা-বাবার একমাত্র ছেলে। ছয় মাস আগে বিয়ে করছে। রোজার ঈদের পর গ্রামের অন্যদের সঙ্গে নোয়াখালী গেছিল। এখন ঈদের আগে তাদের বাড়িতে শুধু কান্না।’

স্থানীয়রা জানান, একই এলাকার ২৫ জনের বেশি মানুষ ফেনীর মহিপাল থেকে রডবোঝাই একটি ট্রাকে ওঠেন। ট্রাকটি নওগাঁর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার জাহান সাথী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রাজেন্দ্রবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন ধানক্ষেতে বুধবার সকাল ১০টায় ওই গ্রামের ছয়জনের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বাকি তিনজনের জানাজা রাতে নিজ নিজ এলাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ভাঁরসো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। মরদেহ বহনে ব্যবহৃত পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও সরকার বহন করবে।’