ইরান যুদ্ধ নিয়ে যেসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
আগাম জল্পনার মধ্যে গতকাল বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রত্যাশার বিপরীতে তিনি নতুন কিছু না বলে গত কয়েক দিন ধরে যে অবস্থান জানিয়ে আসছেন, মূলত সেটিরই পুনরাবৃত্তি করেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ কমাতে গিয়ে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরও এড়িয়ে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রায় ২০ মিনিটের প্রাইমটাইম ভাষণে ট্রাম্প বলেন, এক মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের ‘মূল কৌশলগত লক্ষ্য’ এখন ‘সম্পন্ন হওয়ার পথে’। তার মতে, এই অভিযান আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলতে পারে।
তার বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে আগের মতোই কঠোর হুমকি ছিল। তিনি আবারও বলেন, প্রয়োজন হলে দেশটিকে ‘পাথর যুগে ফিরিয়ে’ দিতে বোমা হামলা চালানো হতে পারে।
গত এক সপ্তাহে তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টগুলোর সঙ্গে এই ভাষণের বড় কোনো পার্থক্য ছিল না।
ট্রাম্প এই যুদ্ধকে আমেরিকানদের কাছে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এর পেছনে কারণও আছে—জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানে অধিকাংশ ভোটার সন্তুষ্ট নন।
তিনি মার্কিন নাগরিকদের এই যুদ্ধকে ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে আহ্বান জানান। তার দাবি, গত ১০০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার তুলনায় এটি খুবই সীমিত।
তবে ভাষণের আগে থেকেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরছিল—এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি ট্রাম্প। বরং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তরহীন থেকে গেছে।
প্রথমত, ইসরায়েল এখনো ইরানে হামলা চালাচ্ছে এবং পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ছে। বুধবার তেল আবিবেও এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ট্রাম্পের দেওয়া অতিরিক্ত সময়সীমার সঙ্গে একমত কি না। এ বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার তথ্য নেই।
দ্বিতীয়ত, কয়েক দিন আগেও হোয়াইট হাউস যে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা ইরানের সামনে তুলেছিল, তার কী হলো—সেটিও অজানা। বুধবারের ভাষণে এ নিয়ে কিছুই বলেননি ট্রাম্প।
ওয়াশিংটন কি ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত ফেরত নেওয়ার মতো শর্তগুলো থেকে সরে আসছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
কিন্তু এ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানও অস্পষ্ট। কখনো তিনি ইরানকে ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিতে বলেন, আবার কখনো মিত্রদের নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলছেন।
বুধবার তিনি বলেন, ‘প্রণালিতে যান এবং সেটি নিজেরাই নিয়ে নিন, রক্ষা করুন, নিজেদের কাজে ব্যবহার করুন। কঠিন অংশ শেষ হয়েছে, তাই এখন এটি সহজ হওয়ার কথা।’
এরপর আর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি শুধু বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে প্রণালিটি ‘স্বাভাবিকভাবেই’ খুলে যাবে। তবে এতে তেলের দাম নিয়ে উদ্বিগ্নদের আশ্বস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
ট্রাম্প কিছু মিত্র দেশের সমালোচনা করে বলেন, তাদের ‘দেরিতে হলেও সাহস দেখিয়ে’ প্রণালিটি খুলতে এগিয়ে আসা উচিত।
এর আগে এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন তিনি। তবে এই ভাষণে সে বিষয়ে কোনো কথা ছিল না, যদিও ব্রিফিংয়ে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বলা হয়েছিল।
আরেকটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—স্থলবাহিনীর ভূমিকা কী। হাজার হাজার মেরিন ও প্যারাট্রুপার এই অঞ্চলে গিয়ে ঠিক কী করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সব মিলিয়ে, এই ভাষণের পরও এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কোন অবস্থাকে ‘বিজয়’ হিসেবে দেখছে, তা স্পষ্ট নয়।
আবার ট্রাম্পের বক্তব্য প্রায়ই পরিবর্তিত হয়ার ফলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
এদিকে, প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির গড় মূল্য ৪ ডলারের বেশি হয়েছে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তাও দ্রুত কমছে।