জ্বালানি সংকট কীভাবে সামলাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
এ অবস্থায় এশিয়ার দেশগুলো এখন মরিয়া হয়ে জ্বালানির বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। কেউ কেউ আবার অস্থায়ী সমাধানে ঝুঁকছে। এছাড়া পণ্য বিনিময় কৌশল ও রেশনিংয়ের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিচ্ছে অনেক দেশ।

ফিলিপাইন ইতোমধ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। শ্রীলঙ্কা কর্মসপ্তাহ কমিয়ে চারদিন ও জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। মিয়ানমারে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বিকল্প দিনের নিয়ম চালু করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও শিগগিরই জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে যাচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকটের বর্তমান চিত্র ও সংকট মোকাবিলার কৌশল।
পণ্য বিনিময় বা ‘এনার্জি সোয়াপ’ কৌশল
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে। এ অবস্থায় সংকট মেটাতে নগদ অর্থের বদলে পণ্য বিনিময়ের পথে হাঁটছে অনেক দেশ।
ইন্দোনেশিয়া ও জাপান
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বর্তমানে টোকিও সফর করছেন। এ সফরে ইতোমধ্যে জাপানকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেওয়ার বিনিময়ে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সুবিয়ান্তো।

ভারত ও জাপান
জাপানের সরকারি নথির বরাতে রয়টার্স জানায়, ভারতের সঙ্গে একটি বিনিময় চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে জাপানের সরকার-সমর্থিত তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী সংস্থা ইনপেক্স। এর আওতায় ভারতকে এলপিজি দেবে জাপান এবং বিনিময়ে ভারত থেকে ন্যাপথা ও অপরিশোধিত তেল নেবে।
ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম
ফিলিপাইন ইতোমধ্যে জাপানের কাছ থেকে ডিজেল সহায়তা পেয়েছে। ভিয়েতনামও তাদের জ্বালানি সংকট মেটাতে জাপানের জরুরি সহযোগিতা চেয়েছে।
চীন ও থাইল্যান্ডের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন নিজেদের অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে পরিশোধিত জ্বালানি ও জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। থাইল্যান্ডও একই পথ অনুসরণ করেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভিয়েতনাম। কারণ প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের ৬০ ভাগ এই দুই প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করত দেশটি। এ অবস্থায় ব্রুনাই, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে অতিরিক্ত জেট ফুয়েলের জোগান চেয়েছে ভিয়েতনামের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ
চলমান প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এখন সংকট কাটাতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ।

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল পাওয়ার চেষ্টা করছে। একই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড।
তবে ১১ এপ্রিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি কার্যকর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ও রেশনিং
সংকট এতোটাই তীব্র রূপ নিয়েছে যে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিপাইন ইতোমধ্যে 'জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করেছে।
শ্রীলঙ্কা কর্মসপ্তাহ কমিয়ে চার দিন করেছে এবং জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে।

মিয়ানমারে ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের একদিন পর পর গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়াও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে যাচ্ছে।
ছোট দেশগুলোর উদ্বেগ
চলমান পরিস্থিতিতে রীতিমত আতঙ্কে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের মতো ছোট দেশগুলো। কারণ বড় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছোট দেশগুলোর টিকে থাকা কঠিন।
নিউজিল্যান্ডের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী শেন জোন্স রয়টার্সকে বলেন, ‘আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে জ্বালানির জন্য যে উন্মাদনা তৈরি হবে, তাতে বিকল্প ব্যবস্থা না রাখলে আমাদের মতো ছোট দেশের কথা কেউ মনেই রাখবে না।’
তাই তারা ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা বিনিময় চুক্তি আপতত কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়ার দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে জ্বালানি সংকট মোকাবেলার পথে হাঁটতে হতে পারে।

জাপানের ইনস্টিটিউট অফ এনার্জি ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো হিরোশি হাশিমোতো বলেন, ‘বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আপাতত জ্বালানি ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একে অন্যকে সাহায্য করা এবং বিকল্প উৎসের সঙ্গে আলোচনার জন্য বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলে হবে এশিয়ার দেশগুলোকে।’