পরমাণু অস্ত্রে ঝুঁকবে আহত-কোণঠাসা ইরান?
আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে ইরানের ‘গোপন’ পারমাণবিক প্রকল্প আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আসে। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, শুধু শান্তিপূর্ণ কাজেই তারা পরমাণু শক্তিকে কাজে লাগাবে—এতে গোপনীয়তার কিছু নেই। কোনো ধরনের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা তাদের নেই।
দেশটির তৎকালীন নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ফতোয়া জারি করে পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করলেন।
তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন।
গত মাসের শেষ দিনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি, তার পরিবারের একাধিক সদস্য এবং বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা বলছেন, খামেনির মৃত্যুতে পাল্টে গেছে পরিস্থিতি।
শাসকগোষ্ঠীতে যারা খানিকটা উগ্র ও কট্টরপন্থি, তারা এবার নতুন করে ওই ফতোয়া বদলে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করতে পারে। জনমতও সেদিকেই ঝুঁকছে।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ট্রিটা পার্সি সিএনএনকে বলেন, ‘পরমাণু ফতোয়া এখন আর কার্যকর নেই।’
‘এ প্রসঙ্গে ইরানের অভিজাতদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অভিমতও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এতে খুব একটি বিস্মিত হওয়ারও কিছু নেই। কারণ, ইরান হচ্ছে সেই দেশ যারা দুই বার পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলাকালীন পরমাণু শক্তিধর দুই রাষ্ট্রের কাছ থেকে বোমা হামলার শিকার হয়েছে।’
বছরের পর বছরের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভ্যন্তরীণ চাপ অগ্রাহ্য করেছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি সাক্ষর হয়।
২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে সরে আসেন। পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসনও নতুন চুক্তির বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একের পর এক বৈরি আচরণের শিকার হয়েও খামেনি পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে জাননি। তিনি যে পন্থা অবলম্বন করেন, সেটাকে বিশেষজ্ঞরা ‘কৌশলগত ধৈর্য’ আখ্যা দেন।
এর মাধ্যমে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আগাতে থাকে। অস্ত্র তৈরির জন্য যে মানের পরিশোধিত ইউরেনিয়াম দরকার, তার খুব কাছাকাছি মান পর্যন্ত পৌঁছে যায় ইরান।
পরমাণু কৌশল স্পষ্ট করেননি মোজতবা খামেনি
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার আগে, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, পরমাণু বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী নিহত হন।
পাশাপাশি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত বিমান হামলা—এ সব মিলিয়ে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে ইরানে পরমাণু অস্ত্র তৈরি পক্ষে জনমত ভারী হতে থাকে।
ইসরায়েলি হামলা শুরুর আগেই ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী হুঁশিয়ারি দেয়, প্রয়োজনে পরমাণু নীতি বদলাতে প্রস্তুত তেহরান।
২০২৪ সালে ইরানের পরমাণু প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার আহমাদ হাকতালাব বলেন, ‘ইরানের পরমাণু নীতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং তা করে দেখানো সম্ভব।’
তবে ইরান এখনো জনসম্মুখে তাদের নীতি বদলানোর বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি।
তবে এটা সর্বজনবিদিত, ইরানের হাতে ৪০০ কেজিরও বেশি সমৃদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে যাওয়া ইউরেনিয়াম আছে। বিশেষজ্ঞদের মত, এ পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে বেশ কয়েকটি পরমাণু অস্ত্র বানানো সম্ভব।
আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় ছেলে সন্তান ও দেশটির নতুন নেতা মোজতবা খামেনি যদি উদ্যোগ নেন, তাহলে তার বাবার পরমাণু ফতোয়া বাতিল হতে পারে।
নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েও এখনো জনসম্মুখে আসেননি মোজতবা।
এতে তার শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মত, বেসামরিক ‘নেতার’ অনুপস্থিতিতে ধীরে ধীরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী প্রভাব ফেলছে।
জেরুসালেম পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী প্রধান আহমাদ ওয়াহিদির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলভিত্তিক গণমাধ্যমটি ইরানের বিতর্কিত গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশে হামলার সিদ্ধান্তে একমত নন পেজেশকিয়ান।
তিনি চান ইরানের সব নির্বাহী সিদ্ধান্ত সরকারের মাধ্যমে আসবে, রক্ষীবাহিনীর হাত দিয়ে নয়। কিন্তু এতে রাজি নন ওয়াহিদি। এ নিয়েই দুইজনের দ্বন্দ্ব।
ইরানের পরমাণু নীতি বদলাবে কী না, এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘তিনি নতুন নেতার পরমাণু কৌশলের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন। ’
চলতি মাসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ‘আমার ধারণা, এটা আগের নীতি থেকে খুব একটা বদলাবে না। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানার জন্য আমাদেরকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।’
ইরানের ধৈর্য ধরার আর তেমন কোনো কারণ নেই
নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়ে মোজতবা খামেনি প্রথম যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন, সেটা তিনি নিজে, সশরীরে দেননি। টিভির সঞ্চালক সেটা পড়ে শোনান। ওই বিবৃতিতে তার বাবা ও অন্যান্যদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। তবে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে কিছুই বলেননি তিনি।
যার ফলে ওই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।
ইরানের যেসব নেতা এখনো বেঁচে আছেন, তারা পরমাণু নীতি বদলের স্থানীয় চাপকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) এখন দেশের ক্ষমতা সমন্বিত করছে। তারা অবসরপ্রাপ্ত ও কট্টরপন্থি সাবেক সেনাদের বড় বড় পদে বসাচ্ছে।
দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে অসংখ্য টগবগে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ তরুণ যোদ্ধাকে তারা নেতৃত্ব দেবেন।
এক কট্টরপন্থি সঞ্চালক ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা ইরানের ইতিহাসের নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। এই যুদ্ধের পর ইরান একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির স্বীকৃতি পাবে। আমাদেরকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে অথবা জোগাড় করতে হবে।’
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ হামলাকে ইরানের কট্টর নেতা ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা পরমাণু নীতি ও কৌশল ঢেলে সাজানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
এমনই মত দেন ‘ইরান অ্যান্ড দ্য বম্ব: দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ইরান অ্যান্ড দ্য নিউক্লিয়ার কোয়েশ্চান’ বইয়ের লেখক সিনা আজোদি।
আজোদি বলেন, ‘মূলত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়ে এতদিন পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়নি।’
‘কিন্তু এখন যেহেতু সেই হামলা তারা করেই ফেলেছে, তেহরানের আর অন্য কিছু নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই’, যোগ করেন তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আজোদি আরও জানান, ‘এই যুদ্ধ ইরানের জন্য অনেক ধরনের শাস্তি নিয়ে এসেছে। যার ফলে সব মৌলিক চিন্তাধারা আমূলে বদলে যাচ্ছে।’
যুদ্ধে কি পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার বাড়বে?
ইতোমধ্যে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, একমাত্র পরমাণু অস্ত্রই পারে একটা দেশকে সুরক্ষিত রাখতে। কারো অস্ত্রাগারে পারমাণবিক বোমা থাকলে বিশ্বের অন্য যেকোনো রাষ্ট্র তাদের ওপর হামলা চালানোর আগে দ্বিতীয়বার ভাববে।
‘বৈরি ও দুর্বিনীত’ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়েও এ কারণে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।
এমন কী, কোনো এক কথার ফাঁকে কিম জং দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও পিয়ংইয়ং এর কাছে আছে। আর সেই ক্ষেপণাস্ত্রে ‘পারমাণবিক বোমা’ যুক্ত করাও তেমন কঠিন নয়।
ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক আজোদি বলেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো, খামেনির ফতোয়া বদলে দেওয়া, পরিশোধিত ইউরেনিয়াম এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির অবকাঠামো।
আজোদি জানান, যদি ইরানের শাসকদের কাছে পরিশোধিত ইউরেনিয়াম থাকে, তাহলে খুব জটিল বা নিখুঁত না হলেও কাজ চালানোর মতো একটি পরমাণু বোমা তারা খুব সহজেই বানাতে পারবে।
সহজ-সরল এই বোমাটিও পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবে।
এই বোমা ক্ষেপণাস্ত্রে যুক্ত করে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর উপযোগী হবে না। তবে ইরান পারমাণবিক বিস্ফোরণ দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করতে পারবে।
এতে উত্তর কোরিয়ার মতো ইরানও সম্ভাব্য হামলাকারীদের থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে।
আজোদি বলেন, ‘তবে এ ধরনের পরমাণু অস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় দেখাতে পারবে না ইরান। এটা কোনো ভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে না। আর যদিও সেটা সম্ভব হয়, তবুও ৫০টি পরমাণু বোমা দিয়ে আপনি পাঁচ হাজার বোমার মালিককে প্রতিহত করতে পারবেন না।’
তিনি মত দেন, ইরান সব সময়ই ইরাক, ইসরায়েল ও সাম্প্রতিক সময়ে, সৌদি আরবকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
যদি ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে আসে, তাহলে শিগগির সৌদি আরবও সে পথে হাঁটবে।
সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আট বছর আগে তার এই ইচ্ছের কথা মুখ ফুটে বলেও ফেলেছিলেন।
২০১৮ সালে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে অনুসরণ করব। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, এ মুহূর্তে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে ইরানের ‘হারানোর কিছু নেই’
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অনেক আগেই আরোপ হয়েছে। হামলার ভয় ছিল, সেই হামলাও শুরু হয়েছে, এবং এতে অংশ নিয়েছে ইরানের সবচেয়ে বড় দুই শত্রু—যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল।
সবচেয়ে বড় কথা, এখন তেহরানের শাসকগোষ্ঠী আত্মবিশ্বাসের সাথে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, ‘নিজেদের রক্ষা করতেই আমরা এটা বানিয়েছে। আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।’



