ইরান যুদ্ধ: ফিলিপাইনে জ্বালানি সংকট, প্রথম দেশ হিসেবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফিলিপাইন বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় জ্বালানি সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আজ বুধবার বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল মঙ্গলবার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। তিনি দেশের জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা ও প্রাপ্যতার ওপর ‘আসন্ন বিপদের’ কথা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে খবরে বলা হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি এর দামও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ফিলিপাইন তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ৯৮ শতাংশই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

মঙ্গলবার মার্কোস বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে সরকারকে জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হলো।

এই আদেশের অধীনে জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সুশৃঙ্খল বণ্টন তদারকি করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে সরাসরি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

এই জরুরি অবস্থা এক বছর বহাল থাকবে, যদি না প্রেসিডেন্ট এর আগে এটি প্রত্যাহার করেন বা এর মেয়াদ না বাড়ান।

জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ফিলিপিনো পরিবারগুলো যে ‘চরম সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা স্বীকার করে নিতে বেশ কয়েকজন সিনেটর মার্কোসকে অনুরোধ জানানোর পর এই ঘোষণা এলো।

দেশটির অন্যতম প্রধান শ্রমিক সংগঠন ‘কিলুসাং মায়ো ইউনো’ (কেএমইউ) এই জরুরি অবস্থা ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা একে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতার একটি ‘স্বীকারোক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, আগে পরিস্থিতি হালকাভাবে দেখানো হয়েছিল। তারা বলেছে যে, এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তা ছিল বিভ্রান্তিকর।

কেএমইউ এই নির্বাহী আদেশের ‘শ্রমিক-বিরোধী বিধান’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে সেই ধারাগুলো নিয়ে, যা ধর্মঘটসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটায় এমন কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।

তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে, যখন জ্বালানির দাম মানুষের উপার্জনের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে, তখন এই আদেশ শ্রমিকদের প্রতিবাদ করার ক্ষমতাকে কার্যত খর্ব করবে।

অন্যদিকে, শীর্ষস্থানীয় ইউটিলিটি কোম্পানিগুলোর প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ম্যানুয়েল ভি. পাঙ্গিলিনান সরকারের এই বিশেষ জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারের ধীরগতির পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পরিবহন শ্রমিক এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের কর্মীরা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনের ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছেন।

ধর্মঘটের নেতৃত্বে থাকা পরিবহন ইউনিয়ন জোট ‘পিস্টন’ বেশ কিছু জোরালো দাবি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি শুল্ক প্রত্যাহার, তেলের দাম কমানো, বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতা বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ভাড়া ও মজুরি বৃদ্ধি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির সরকার পরিবহন চালকদের ভর্তুকি প্রদান, ফেরি চলাচল হ্রাস এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।

এর আগে মঙ্গলবার ফিলিপাইনের জ্বালানিমন্ত্রী শ্যারন গ্যারিন জানান, দেশে মাত্র ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত অবশিষ্ট রয়েছে।

গ্যারিন সাংবাদিকদের বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আকাশচুম্বী দামের কারণে সরকার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ‘সাময়িকভাবে’ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হবে।

হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে এশিয়ার দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। গত বছর এই জলপথ দিয়ে আসা মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল এশিয়াগামী।