যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত যে শীর্ষ নেতাদের হারাল ইরান
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে বড় ছন্দপতন ঘটেছে। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান এ হামলায় প্রথম দিকেই নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গতকাল বুধবার ইরানের গোয়েন্দা বিভাগের মন্ত্রী নিহত হওয়ার খবর জানা যায়।
এ ছাড়া ইরানের প্রশাসনের একাধিক ঊর্ধ্বতন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব সংকটের বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়নি। বরং ইরান ইতোমধ্যে একদিকে যেমন নতুন সর্বোচ্চ নেতা বেছে নিয়েছে, অপরদিকে তাদের শাসনকাঠামো কখনো নেতৃত্বহীন হবে না বলেও আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে।
গত বছর জুনে ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানীর মৃত্যু এবং এবারের যুদ্ধে হতাহতের ঘটনার মধ্যেই প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
গতকাল বুধবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসে গত ১৯ দিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম।
সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর প্রথম দিনই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রাখেন।
আলি লারিজানি
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন আলি লারিজানি। জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন তিনি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার একজন বিচক্ষণ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৮ শতকের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে নিয়ে বই লেখা থেকে শুরু করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির মধ্যস্থতা—সবখানেই ছিল তার পদচারণা।
গত ১৭ মার্চ ইরানের পারদিস এলাকায় বিমান হামলায় নিহত হন ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি। ওই হামলায় মারা যান তার ছেলেও।
ইসমাইল খতিব
ইরানের গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা বিভাগেও কাজ করেছেন ইসমাইল খতিব। তবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও কট্টর ধর্মগুরু হিসেবে। গতকাল ১৮ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন তিনি।
গোলামরেজা সোলেইমানি
আইআরজিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেও আধাসামরিক বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে বেশি পরিচিত তিনি। ১৯৮২ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বাসিজে যোগ দেন সোলেইমানি। পরে ধীরে ধীরে তার পদোন্নিত হয়। ২০১৯ সালে ইরানে হিজাব ইস্যুতে বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে।
১৭ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
আলি শামখানি
আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন আলি শামখানি। একইসঙ্গে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার তদারকি করতেন তিনি। আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনির ওপর হামলার দিন তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল ইসরায়েল।
মোহাম্মদ পাকপুর
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রধান ছিলেন মোহাম্মদ পাকপুর। এর আগে স্থলবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলে সঙ্গে যুদ্ধে তার পূর্বসূরি হোসেন সালামি নিহত হলে আইআরজিসি প্রধান নিযুক্ত হন পাকপুর। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তিনি নিহত হন।
আজিজ নাসিরজাদেহ
আজিজ নাসিরজাদেহ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। এর আগে তিনি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান এয়ার ফোর্সের (আইআরআইএএফ) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন তিনি। তার মৃত্যুকে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের জন্য বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ই বর্তমানে এই সংঘাতে ব্যবহৃত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করে।
আব্দুলরাহিম মুসাভি
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে তার পূর্বসূরি মোহাম্মদ বাঘেরি নিহত হলে তিনি এই পদে নিযুক্ত হন। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলায় নিহত হন মুসাভি।
মোহাম্মদ শিরাজি
খামেনির সামরিক ব্যুরোর প্রধান ছিলেন শিরাজি । ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার সমন্বয়ের কাজ করতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন তিনি।
হোসেইন জাবাল আমেলিয়ান
ডিফেন্সিভ ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ অরগানাইজেশনের (এসপিএনডি) প্রধান ছিলেন হোসেইন জাবাল আমেলিয়ান। অস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতেন তিনি, যার মধ্যে পারমাণবিক, জৈব ও রাসায়নিক প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল। হামলার প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিহত হন।
রেজা মোজাফফারি-নিয়া
এসপিএনডির সাবেক প্রধান হলেও পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন প্রচেষ্টায় রেজা মোজাফফারি-নিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত হন তিনি।
সালেহ আসাদি
ইরানের জরুরি কমান্ড কাঠামোর গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন সালেহ আসাদি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ইরানের পররাষ্ট্র কৌশল নির্ধারণে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তিনিও নিহত হন।
রয়টার্স জানায়, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক হামলায় ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ওপর।