বিশ্লেষণ

কেন দীর্ঘদিন হরমুজ অচল রাখতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান

স্টার অনলাইন ডেস্ক

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া দুই দেশের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ বা ‘সামান্য আঘাত’ বলে উপস্থাপন করলেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক জটিল।

৩৮ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল ইরানের ওপর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে সেই সাফল্যকে তারা কৌশলগত আধিপত্যে রূপান্তর করতে পারেনি।

উল্টো ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে।

যেসব কারণে হরমুজে দীর্ঘ অচলাবস্থা সম্ভব নয়

চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ও এর ব্যর্থতা।

গত ৫ মে হরমুজে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে চলাচলে সহায়তা করার জন্য ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। কিন্তু মাত্র ৫০ ঘণ্টার মাথায় সেটি আবার স্থগিত করেন তিনি।

প্রজেক্ট ফ্রিডমের মাধ্যমে ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়তে চেয়েছিলেন ট্রাম্প।

শতাধিক যুদ্ধবিমান ও কয়েকটি নৌ-বিধ্বংসী জাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল তার। বাস্তবে মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ সেই পথ ব্যবহার করেছিল।

পরিকল্পনাটি নিয়ে প্রথম আপত্তি তোলে সৌদি আরব। দেশটির অভিযোগ, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

সৌদি আরবের শঙ্কা ছিল, এতে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এছাড়া বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি।

জাহাজ শিল্পবিষয়ক পত্রিকা ‘লয়েডস লিস্টে’র সম্পাদক রিচার্ড মিড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, বড় কোনো শিপিং সংগঠনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়ে আলোচনা করেনি।’

তিনি বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আমি যেসব জাহাজ মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কেউই মনে করছে না, এতে পরিস্থিতি বদলাবে।’

এখনো বড় হুমকি ইরান

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে হামলা চালানো ও কার্যত পুরো নৌ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে ১ হাজার ৫৫০টির বেশি জাহাজ আটকে আছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বুধ ও বৃহস্পতিবার কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেনি।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের থিঙ্কট্যাঙ্ক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ বুরচু ওজচেলিক বলেন, ইরান নিজেকে এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প একটি দ্রুত জয় চেয়েছিলেন, কিন্তু শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি হঠানোর জন্য যে বিশাল সামরিক শক্তি প্রয়োজন ছিল, তা নিয়োগ করতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভক্তি থাকলেও মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা আপাতত দেশটির শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্ত করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের এখনো প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ৭৫ শতাংশ উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে। তাদের অর্ধেক শাহেদ ড্রোনও টিকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে, ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও প্রায় অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে।

তবে এ দাবি পূরণে ট্রাম্প আবারও বড় আকারের হামলা শুরু করতে অনিচ্ছুক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

হুমকিতে ইরানের অর্থনীতি

কূটনীতিকদের মতে, ইরান প্রায়ই এমন আচরণ করে যেন তাদের হাতে অসীম সময় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়।

হরমুজের পূর্বদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরান নিজেদের তেল রপ্তানিও করতে পারছে না। ১৩ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৫২টি জাহাজ ফিরিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্ট্রাল কমান্ড।

এ অবস্থায় ইরানের অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বেতন না পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এ নিয়ে ইতোমধ্যে অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ ও গণমাধ্যম প্রচারণার মাধ্যমে ইরানের জাতীয় ঐক্য ধ্বংস করতে চাইছে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান আরও ৩ থেকে ৪ মাস টিকে থাকতে পারলেও বড় সংকটে পড়বে।

মিত্রহীন ইরান

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ইরানের ঘনিষ্ঠ কোনো শক্তিশালী মিত্র নেই।

চীন ড্রোনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে গোপনে হাতে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোরও খবর রয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ’র একটি নথিতে ইরানকে ৫ হাজার ফাইবার-অপটিক ড্রোন দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব সহায়তা মূলত খুব সাধারণ মানের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনার মতো নয়।

২ দেশইএখন চাপে

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু টিকে থাকার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জনগণের জন্য বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিশেষজ্ঞ বুরচু ওজচেলিক বলেন, এটি আসলে বিদ্রোহীদের এক ধরনের দ্বিধা। শুরুতে টিকে থাকাকেই জয় মনে করে তারা। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন শুধু টিকে থাকাই যথেষ্ট নয়। ইরান কখন সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে, আমরা জানি না।

ট্রাম্পও চাপে রয়েছেন। কারণ তার শুরু করা সংকট এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজকে ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থির এবং দুইপক্ষের সামরিক বাহিনী এখনো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি দিন কোনো পক্ষই এ পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারবে না।