ইরানের পর কিউবা, রুবিওকে দায়িত্ব দিয়েছেন ট্রাম্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আবারও আলোচনায় কিউবা। ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দ্বীপদেশটি ছয় দশকের বেশি সময় পর বিশ্বমঞ্চে আবারও আলোচনায় এলো। সেসময় বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর দেশটির কণ্ঠে ছিল ‘সিংহের’ স্বর। সময়ের পরিক্রমায় তা এখন অনেকটাই যেন ‘খাঁচায় বন্দি বুড়ো সিংহের’ চেয়েও দুর্বল।

দেশ বাঁচাতে কিউবার বর্তমান রাষ্ট্রপতি মিগেল দিয়াজ কানেল দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।

কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

 

বৈশ্বিক রাজনীতিতে কিউবা নামটি এলে এখনো অনেকে ‘ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের’ কথা স্মরণ করেন। ঘটনাটি প্রায় ৬৪ বছর আগের হলেও এখনো তা আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জাজ্বল্যমান’।

মার্কিন রাজনীতিকদের অনেকের কাছে কিউবা এখনো ‘গলার কাঁটার’ সামিল। আর তাই ছয় দশকের বেশি সময়ের পর আজও হোয়াইট হাউস হানা দিতে চায় হাভানার অন্দরে।

ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছে থাকা ‘শত্রুর’ নাম কিউবা। বর্তমানে ‘গালফ অব আমেরিকা’ হয়ে যাওয়া মেক্সিকো উপসাগরের এই ছোট দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে।

USA Cuba
 যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কিউবার অবস্থান। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

 

অন্যদিকে, কিউবার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন ৯০ গুণ বেশি। তা সত্ত্বেও, ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটনের ‘মাথা ব্যথা’ হয়ে আছে দেশটি। এবার যেন এই ‘ব্যথা’ থেকে মুক্তি পেতে বদ্ধপরিকর ক্যাপিটল হিল।

এদিকে, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার মধ্যেই আচমকা হামলার নির্দেশ দিয়ে বসেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য হিসেবে একবার বলেছেন যে তিনি তেহরান সরকারের পতন চান।

আবার, ট্রাম্প এটাও বলেছেন যে ইরান সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়।

তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা ইরানকে ক্রমশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে। প্রতিবেশী দেশগুলোয় ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় সেই যুদ্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

এর ফলে বেড়ে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম। ব্যাহত হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্য।

এমন পরিস্থিতিতে গত ৬ মার্চ সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়—‘সিএনএনকে ট্রাম্প বলেছেন শিগগির কিউবার পতন হচ্ছে: মার্কোকে সেখানে রাখছি’।

ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফাইল ছবি: রয়টার্স 

 

প্রতিবেদনে অনুসারে, সেদিন সকালে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমটিকে এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে আরও জানিয়েছিলেন যে কিউবার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে মরিয়া।

এমনকি, বিষয়টি দেখভালের জন্য ট্রাম্প তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

মায়ামিতে জন্ম নেওয়া কিউবা-বংশোদ্ভূত মার্কো রুবিও কিউবা পরিস্থিতি ‘ভালো বোঝেন’ বলে অপর এক ঘটনায় মন্তব্য করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাষ্ট্রপতি আরও বলেন যে, ‘ওরা (কিউবার সরকার) চুক্তি করতে চায়। তাই আমি মার্কোকে দায়িত্ব দিয়েছি বিষয়টি নিয়ে কাজ করার। এখন দেখবো কেমন কাজ হয়। আমরা এখনো বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। কিন্তু, কিউবা প্রস্তুত হয়ে আছে—৫০ বছর পর।’

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হাভানার জনজীবন। ছবি: রয়টার্স
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হাভানার জনজীবন। ছবি: রয়টার্স

 

ট্রাম্প এটাও জানান যে তিনি ইরান-যুদ্ধকে এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ৫০ বছর ধরে কিউবাকে পর্যবেক্ষণ করে আসছেন জানিয়ে জোর দিয়ে বলেন যে, তার হস্তক্ষেপের ফলেই কিউবার পতন হতে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, এ ঘটনার একদিন আগে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প আমেরিকান-কিউবানদের উদ্দেশে বলেছিলেন যে, তারা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। তাদের ফেরা এখন ‘সময়ের ব্যাপার’। ইরান-যুদ্ধের পর ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী কাজ হবে কিউবাকে নিয়ে—এমনটিও জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অন্য কাজে ব্যস্ত আছেন। সেসব শেষ হলে তিনি কিউবার কাজে হাত দেবেন বলেও মন্তব্য করেছেন দেশটির মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি।

ট্রাম্প আরও জানান, মার্কো রুবিও কিউবা নিয়ে কাজ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে রুবিও বলেছেন যে তার হাতে এখন যে কাজ আছে তা শেষ করার পর তিনি কিউবা নিয়ে এগোবেন।

সেদিন ট্রাম্প তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশংসা করে বলেছিলেন, রুবিও কিউবা নিয়ে ভালো কাজ করছে। পাশাপাশি, কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে উৎখাতের হুমকিও দিয়েছেন। বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলে তার প্রশাসন কিউবা নিয়ে কাজ করবে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার এক প্রতিবেদন জানায়—ট্রাম্প প্রশাসন নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কিউবার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলার কাজ করছে।

এতে আরও জানানো হয়, ট্রাম্প মিত্রদের নিয়ে কিউবার শাসকদের ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত জানুয়ারিতে মার্কিন সেনারা ভেনেজুয়েলার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে রাজধানী কারাকাস থেকে তুলে আনার পর ভেনেজুয়েলার তেল কিউবায় যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিউবার অর্থনীতি ভীষণভাবে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

 

এই কিউবাকে নিয়ে ট্রাম্প আগেও একবার মন্তব্য করেছিলেন, দেশটির ‘পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র’।

নিশানায় হাভানা

 

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদন অনুসারে—কিউবার সরকার এখনো নিজ দেশের ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্যাতন ও সরকারের সমালোচনা কঠোর হাতে দমন করছে। সরকারবিরোধীদের এখনো জেল-জরিমানা গুণতে হচ্ছে। এখনো হাজারো বিরোধী বন্দি-জীবন কাটাচ্ছেন।

দেশের বিদ্যমান সমস্যার জন্য হাভানা সরকার মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে যাচ্ছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনটি আরও বলা হয়—এটিকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রেক্ষাপট হিসেবে প্রচার করছে কিউবার শাসকশ্রেণি। কিউবায় বিরোধী-দমন রোধের পরিবর্তে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বেশি প্রচারণা চালাচ্ছে হাভানার কমিউনিস্ট সরকার।

গতকাল ৭ মার্চ আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে কিউবার জনজীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হাভানার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ‘সর্বোচ্চ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকটের জেরে সাইকেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে কিউবার বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স
নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকটের জেরে সাইকেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে কিউবার বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স 

 

ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো দেশ কিউবার কাছে তেল বিক্রি করলে সেই দেশকে চরম অর্থনৈতিক শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিউবা বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল ব্যবহার করায় তেলকে দেশটির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে দেখা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে কিউবায় বিদ্যুৎ-বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে—কিউবা মানবিক ‘বিপর্যয়ের’ দ্বারপ্রান্তে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে দেখছেন কিউবায় সরকার পতনের লক্ষণ হিসেবে।

গতকাল দক্ষিণ ফ্লোরিডায় বহুজাতিক সামরিক সহযোগিতা ‘শিল্ড অব দি আমেরিকাস’ সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন অর্জনের পর কিউবায় দ্রুত সরকার পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছি।’

তার ভাষ্য: কিউবার সরকার তাদের পতনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাদের টাকাও নেই, তেলও নেই। তারা যে আদর্শ নিয়ে চলছে তা ভালো না। তাদের সরকার ভালো না। তারা দীর্ঘদিন ধরে কিউবার ক্ষতি করে যাচ্ছে।

কিউবায় সরকার পরিবর্তন ‘সহজ’ হবে বলেও মনে করেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি। হাভানায় অন্তর্বর্তী সরকারে জন্য চুক্তিও সহজে করা যাবে, বলে আশা ট্রাম্পের।

কিউবায় বিদ্যুৎ-বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
কিউবায় বিদ্যুৎ-বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

 

গত ৬ মার্চ বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্লেষকরা মনে করেন যে কিউবার সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের নেতৃত্বের কারণে নয়।

এতে আরও বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কিউবার শীর্ষ নেতাদের আলোচনার যে সংবাদ জানা যাচ্ছে হাভানার সরকার তা নিশ্চিত করেনি। দেশটির শাসকরা বেসরকারি উদ্যোগে জ্বালানি তেল কিনে ব্যবসা চালানোর জন্য সীমিত আকারে অনুমতি দিলেও এর মাধ্যমে চলমান সমস্যার খুব একটা পরিবর্তন হবে বলে মনে করছেন না কিউবাবাসীদের অনেকে।

বাস্তবতা হচ্ছে—১৯৬০ এর দশক থেকে মার্কিন-মিত্রদের অর্থনৈতিক অবরোধ-নিষেধাজ্ঞার পরও টিকে থাকা কিউবায় যেন এবার মরণ কামড় বসাতে যাচ্ছেন মার্কিন রাজনীতিকরা। আর সে কথাই পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।