যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে যা করতে পারে ইরান
ইরানের ওপর আজ শনিবার ভোরে যৌথ সামরিক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ‘এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘লায়নস রোর’নামে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর বিপরীতে পাল্টা আঘাত হানছে ইরানও।
ইরানের গণমাধ্যম ইরনাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে খামেনি সরকার, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীসহ (আইআরজিসি) দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি) এ পর্যন্ত কী ধরনের জবাব দিচ্ছে ও দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পরই পাল্টা হামলা শুরু করেছে তেহরান।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’।
ইতোমধ্যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ৫টি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানায়, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে কঠোরভাবে হামলা চালিয়েছে।
পাশাপাশি ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্র লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
আরও যা করতে পারে ইরান
বার্তাসংস্থা এপি জানায়, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে ইরান। তবে এ যুদ্ধ থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে এবং গত ৮ মাসে ক্ষতি কাটিয়ে পাল্টা হামলার প্রস্তুতিও নিয়েছে দেশটি।
ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী ইরানের কাছে এখনো শত শত মাঝারি থেকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যাও কম নয়।
ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ৫০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরান। এরপর আবার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন করেছে তারা।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সম্মিলিত মজুত এখন হাজারের ঘরে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেপণাস্ত্রযুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা রাখে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ এপিকে বলেন, ‘ইরানের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার প্রায় অক্ষত রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের ভেতরে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও সমুদ্রে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত কঠিন নয়।’

এর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়। তবে এর মধ্যেও কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে মোসাদের সদর দপ্তরসহ সামরিক স্থাপনার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নজিরবিহীনভাবে কম। এ কারনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে হামলার কার্যকারিতা বাড়াতে কীভাবে সময় ও গতি সমন্বয় করতে হয়, সে অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে ইরান।
ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণস্থল গোপন রাখতেও তেহরান তৎপর বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে মাইন পেতে রাখা প্রতিশোধের আরেকটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে। তবে এক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, এতে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর চীন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ইরান এর আগে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে। গত সপ্তাহে সামরিক মহড়ার সময় আংশিকভাবে তা বন্ধ করার দাবি করেছে তেহরান।
উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবে এক হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়, যাতে সাময়িকভাবে দেশটির অর্ধেক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ সালের মতো ইরান কাছাকাছি কোনো ট্যাংকার জাহাজ হয়রানি বা জব্দ করতে পারে, অথবা মিত্র মিলিশিয়াদের দিয়ে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে। হুতি বিদ্রোহী বা ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের মতো আঞ্চলিক মিত্ররা দূতাবাস বা কম সুরক্ষিত ঘাঁটিতেও হামলা চালাতে পারে।
এ ব্যাপারে আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান স্ট্র্যাটেজি প্রজেক্টের প্রধান নেট সোয়ানসন জানান, ‘ইরান দুর্বল হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকৃত ক্ষতি করার উপায় এখনো তার হাতে রয়েছে এবং আগের চেয়ে তা প্রয়োগের সম্ভাবনাও বেশি।’
তিনি বলেন, ‘ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন, ট্রাম্পকে অন্তত একবার আঘাত করতে না পারলে ঝুঁকি আরও স্থায়ী হবে।’
তবে ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের শীর্ষ কর্মকর্তা জন অল্টারম্যান মনে করেন প্রতিক্রিয়া হবে পরিমিত।
তিনি বলেন, ‘ইরান কখনোই দীর্ঘমেয়াদি প্রচলিত যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী ছিল না।’