কোন পথে পাকিস্তান-আফগানিস্তান ‘যুদ্ধ’
পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে দীর্ঘকাল উপেক্ষা করার পর, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ এবার তার সামরিক সক্ষমতার পূর্ণ প্রদর্শনী শুরু করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ এই পরিস্থিতিকে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পাকিস্তানের ‘ধৈর্যের সীমা অতিক্রম’ করেছে আফগানিস্তান।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তানের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুই দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর মধ্যকার এ সীমান্ত সংঘাত ভবিষ্যতে কোন দিকে রূপ নিতে পারে? দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কিছু চিত্র।
সংঘাতের শুরু
পাকিস্তান এবার কোনো রাখঢাক বা লুকোছাপা না করেই একটি সুনির্দিষ্ট নামে (অপারেশন গাজাব লিল-হক) আফগানিস্তান রাজধানী কাবুলসহ বেশকিছু এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এটি সাব-কনভেনশনাল বা ছদ্মবেশী যুদ্ধ থেকে একটি সরাসরি এবং প্রকাশ্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সামরিক সংঘাতে উত্তরণের স্পষ্ট লক্ষণ।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি স্পষ্ট করেছেন, পাকিস্তানের বিরোধ আফগান জনগণের সাথে নয় বরং সেসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যারা আফগান সীমান্তে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানে রক্তপাত ঘটাচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সরাসরি তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির নাম বার বার প্রকাশ্যে এসেছে। উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এই টিটিপি-কে দায়ী করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং রিপোর্টগুলো ধারাবাহিকভাবে আফগানিস্তানে টিটিপির সরব উপস্থিতি এবং বর্তমান তালেবান শাসনের সাথে তাদের গভীর যোগসূত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং রিপোর্টের প্রশংসা করে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, টিটিপি ছাড়াও জামাত-উর-আহরার (জেইউএ) ও হিজব-উল-আহরার (এইচইউএ) এর মতো সশস্ত্র দলগুলো আফগানিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে পাকিস্তানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ গোষ্ঠীগুলো ২০২০ সালের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে অন্তত শতাধিক হামলার পেছনে দায়ী বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এ গোষ্ঠীগুলোকে সম্মিলিতভাবে ‘পাকিস্তানি তালেবান’ বলে ডাকা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এদের সন্ত্রাসী তৎপরতা আরও বেড়েছে বলেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’
দুই দেশের সামরিক বাস্তবতা
গত প্রায় ২৪ ঘণ্টায় অপারেশন গাজাব লিল-হক বা ‘ন্যায়ের হামলা’য় পাকিস্তান বিমান বাহিনী কাবুলের উপকণ্ঠসহ কান্দাহার, পাক্তিয়া এবং নানগারহার প্রদেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী আস্তানা ও কৌশলগত অবস্থানে অনুপ্রবেশ করে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে।
হামলায় ২৭০ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।
প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সীমান্ত শহরগুলোতে প্রতিশোধমূলক পাল্টা আক্রমণের ঘোষণা দেয় আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের বিশ্লেষণে বলা হয়, নিজেদের জনসমর্থন ধরে রাখতে এবং ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি রক্ষায় তালেবান নেতৃত্ব প্রথাগত যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে মূলত পাকিস্তানের সামরিক শক্তির ফাঁদেই পা দিয়েছে।
ডন আরও জানিয়েছে, তালেবান নেতৃত্ব ধারণা করেছিল, ২০২৫ সালের অক্টোবরের সংঘর্ষের মতো এবারের উত্তেজনাও কাতার বা তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দ্রুত প্রশমিত হবে। তবে তারা ইসলামাবাদের বর্তমান কঠোর অবস্থান বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
কেননা, তালেবান গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ছেড়ে সরাসরি আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে মূলত পাকিস্তানের শক্তির কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করে দেবে। পাকিস্তানের বিমান শক্তি এবং প্রথাগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সামনে তালেবানের এই সম্মুখ যুদ্ধ একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশ্লেষক আব্দুল বাসিত বলেন, 'পাকিস্তানের তুলনায় সামরিক শক্তিতে সক্ষমতা কম থাকায় আফগান তালেবানরা পাল্টা-হামলার জন্য অপ্রচলিত পদ্ধতি যেমন আত্মঘাতী বোমা হামলার দিকে যেতে পারে।'
অবশ্য বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংঘাতের সমাধান চান বলে জানিয়েছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি এবং এখনও চাই এই সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমেই হোক।’
তবে নিজেদের ভূখণ্ডে টিটিপির অবস্থানের কথা অস্বীকার করে বিষয়টিকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। এ পর্যন্ত সংঘর্ষে পাকিস্তানের ৫৫ জন সেনা নিহতের দাবি করে আফগান সরকারের মুখপাত্র হুঁশিয়ার করেন, ‘পাকিস্তান হামলা চালিয়ে যেতে থাকলে তার কঠোর জবাব দেওয়ার সামর্থ্য আছে কাবুলের।’
কূটনৈতিক তৎপরতা
সংঘাত নিরসন ও উত্তেজনা হ্রাসে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাতার ও সৌদি আরব এর আগে দুদেশের মধ্যে সফল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে এবং বর্তমানেও পর্দার আড়ালে সক্রিয় রয়েছে। চীন ও তুরস্কের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দুই দেশের ওপর রয়েছে, যা সংঘাত প্রশমনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ইরান ও রাশিয়া তাদের সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ‘সংলাপ ও প্রতিবেশীদের মধ্যকার আদর্শিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে’ সংঘাত নিরসনের জন্য দুদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, এখনি সীমান্ত হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের পথে এগোতে দুই দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া।
তুরস্কের শীর্ষ কূটনীতিবিদ হাকান ফিদান পৃথক ফোনকলে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।
নিজেদের উপায়ে চীন মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে বলে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং।
সীমান্ত বন্ধের আগে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয় বলে জানায় পাক-আফগান জয়েন্ট চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পর দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত তীব্র হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে পূর্ব-দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতিতে এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
তাই ভবিষ্যতে অস্ত্রের বদলে আলোচনার টেবিলে এ সংঘাত সমাধানের দিকে মনোযোগী অন্যান্য দেশগুলো।