পাহাড়ি খাবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঢাকায় মুংডি
এক বাটি মুংডিতে নেই ঘন ঝোলের বাহার, নেই অতিরিক্ত মসলার ব্যবহার। হালকা মুরগির স্টকে তৈরি স্বচ্ছ স্যুপে ভাসে হাতে তৈরি চালের নুডলস। সঙ্গে থাকে ডিম, মুরগি, মাছ কিংবা চিংড়ি। প্রতিটি উপাদান আলাদা করে চেনা যায়, আর স্বাদে ফুটে ওঠে খাবারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
ঢাকার অনেক মানুষের কাছেই ‘মুংডি’ নামটি এখনও অপরিচিত। সেই অচেনা পাহাড়ি খাবারকে রাজধানীর মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলতেই কাজ করছেন মুংডি রেস্টুরেন্টের প্রতিষ্ঠাতা তারা বিকাশ ত্রিপুরা।
তিনি বলেন, ‘মুংডি আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী স্যুপ। এতে খুব বেশি মসলা ব্যবহার করা হয় না। হালকা চিকেন স্টকের স্বাভাবিক স্বাদই এই খাবারের মূল আকর্ষণ।’
এক স্যুপ, পাঁচ রূপ
রেস্টুরেন্টটিতে মুংডির পাঁচটি ভিন্ন রকম পরিবেশন করা হয়—এগ মুংডি, চিকেন মুংডি, ফিশ মুংডি, প্রন মুংডি এবং স্পেশাল মুংডি।
প্রতিটি স্যুপের ঝোল একই ধরনের হলেও ভিন্নতা আসে মূল উপকরণে। কোথাও থাকে পুরো একটি সেদ্ধ ডিম, কোথাও কাটা মুরগির মাংস, আবার কোথাও মাছ বা চিংড়ি।
প্রতিটি বাটিতে ব্যবহার করা হয় হাতে তৈরি চালের নুডলস, যা সরাসরি পার্বত্য অঞ্চল থেকে আনা হয়।
তারা বিকাশ ত্রিপুরার মতে, এতে শুধু খাবারের আসল স্বাদই অক্ষুণ্ন থাকে না, বরং পাহাড়ের সঙ্গে সেই খাবারের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও বজায় থাকে।

চাকরি ছেড়ে স্বপ্নের পথে
নিজের রেস্টুরেন্ট গড়ার আগে প্রায় আট থেকে দশ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন তারা বিকাশ ত্রিপুরা। তবে সেই সময়টাতেও নিজের একটি রেস্টুরেন্ট করার স্বপ্ন লালন করতেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই এমন একটি রেস্টুরেন্ট করার ইচ্ছা ছিল। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর গত বছরের ১৫ জুন মুংডির যাত্রা শুরু করি।’
শুরুর পথ অবশ্য সহজ ছিল না। একদিকে নতুন রেস্টুরেন্ট, অন্যদিকে একেবারেই অপরিচিত খাবার। ফলে কর্মী পাওয়া যেমন কঠিন ছিল, তেমনি গ্রাহকদের আস্থাও অর্জন করতে সময় লেগেছে।
তিনি বলেন, ‘শুরুতে কেউ খুব একটা বিশ্বাস করতেন না। তাই আমি আর আমার কয়েকজন চাচাতো ভাই মিলে সব কাজ সামলাতাম। তিন-চারজন মিলে রান্না থেকে পরিবেশন, সবই করতাম।’
ধীরে ধীরে মানুষ রেস্টুরেন্টটির কথা জানতে শুরু করে। নতুন নতুন গ্রাহক আসতে থাকে।
‘এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছি। মানুষ আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার সম্পর্কে জানছে। সবচেয়ে বড় কথা, তারা খুশি হয়ে ফিরছেন, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি,’ বলেন তিনি।

কেবল মুংডি নয়
রেস্টুরেন্টটির নাম মুংডি হলেও মেনুতে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী পদ।
এর মধ্যে অন্যতম তজা মরিচ ভর্তা। সেদ্ধ সবজি, কাঁচা মরিচ, শুঁটকি, পেঁয়াজ ও সামান্য লেবু দিয়ে তৈরি এই ভর্তা গরম ভাতের সঙ্গে খেতে দারুণ সুস্বাদু।
আছে চিকেন লাকসা। ভাপে সেদ্ধ মুরগির মাংসের সঙ্গে লেবু ও মরিচ মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই টক-ঝাল সালাদধর্মী পদটি।
তারা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘চিকেনটি আগে ভাপে সেদ্ধ করা হয়। এরপর লেবু ও মরিচ দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি টক-ঝাল স্বাদের, অনেকেই নাশতা হিসেবে খেতে পছন্দ করেন।’
এই খাবারগুলোতে ভাপে রান্না, সেদ্ধ, ভর্তা করা কিংবা অল্প মসলা ব্যবহারের মতো কৌশল অনুসরণ করা হয়। ফলে সবজি, পাহাড়ি শাক, বাঁশকোঁড়ল, মাছ ও মাংসের নিজস্ব স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে।

অচেনা স্বাদের সঙ্গে পরিচয়
এই রেস্টুরেন্ট পরিচালনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রান্না নয়, বরং মানুষের কাছে অচেনা খাবারগুলোর পরিচয় তুলে ধরা।
তারা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রথমে সবাই জিজ্ঞেস করেন—এটা কী? নামটাও আগে শোনেননি। তখন ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বলতে হয় খাবারটি কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে খেতে হয়।’
নতুন কোনো গ্রাহক প্রথমবার খাবার চেখে দেখার সময় কিছুটা দুশ্চিন্তাও কাজ করে।
‘ভাবি, উনি পছন্দ করবেন তো? কারণ এই স্বাদের সঙ্গে তারা অভ্যস্ত নন।’
তবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই তাদের এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
‘যখন কেউ বলেন খাবার খুব ভালো লেগেছে, তখন মনে হয় আমাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। মনে হয়, হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যকে আমরা আবার মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছি।’

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াই
খাগড়াছড়িতে বেড়ে ওঠা তারা বিকাশ ত্রিপুরার স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত এই খাবারগুলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাস্ট ফুডের জনপ্রিয়তা বাড়ায় পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী অনেক খাবারই হারিয়ে যেতে বসেছে বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশে ফাস্ট ফুডের বিস্তারের কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি মনে করেন, কোনো খাবার হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি রেসিপি হারিয়ে যাওয়া নয়; হারিয়ে যায় স্থানীয় গাছপালা, উপকরণ ও রান্নার বহু পুরোনো জ্ঞানও। তাই এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল রেসিপি সংরক্ষণ করলেই হবে না, নিয়মিত রান্না, পরিবেশন ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
‘আমি চাই আরও মানুষ এ ধরনের উদ্যোগ নিক। তাহলেই আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে,’ বলেন তিনি।
মুংডি কেবল একটি রেস্টুরেন্টের নাম নয়। এটি পাহাড়ি সংস্কৃতি, উদ্যোক্তার স্বপ্ন ও হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যঐতিহ্যকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার এক আন্তরিক প্রয়াস। রাজধানীর এক বাটি হালকা স্যুপের মধ্যেও তাই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য গল্প।

