যেভাবে পাহাড় থেকে ঢাকায় এলো মুংডি
বাংলাদেশে যেমন, তেমনি বিশ্বজুড়েই সংগীতচর্চা থেকে শুরু করে পোশাক, সবকিছুই এখন ট্রেন্ডনির্ভর। সেই স্রোতের বাইরে খাদ্যাভ্যাসও নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের স্বাদ বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে অভ্যাসও। একটা সময় ছিল, পাহাড়ি স্বাদের খাবার বলতে আমরা বুঝতাম বান্দরবান, রাঙামাটি কিংবা কক্সবাজারে গেলে খাওয়ার সুযোগ পাওয়া কিছু নির্দিষ্ট পদ।
পাহাড়ি জনপদের মানুষের কাছে যে খাবারগুলো নিত্যদিনের, তারই একটি হলো মুংডি।
মুংডি মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত খাবার। সহজ, ঝরঝরে অথচ ভেতরে ভেতরে গভীর স্বাদের এই খাবারটা এখন আর পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি নেমে এসেছে ঢাকার অলিগলিতে। স্ট্রিট ফুডের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। পাহাড় থেকে শহরের মানুষের সন্ধ্যার আদায় জায়গা করে নিয়েছে এই বিশেষ খাবার, যেটা একইসঙ্গে সুস্বাদু এবং উপাদেয়।
কয়েক দিন আগে এমনই এক দৃশ্য চোখে পড়ল ঢাকার সাত মসজিদ রোডে। আগে যেখানে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ক্যাম্পাস ছিল, সেই জায়গাটাতেই গড়ে উঠেছে পথের ধারে ছোট ছোট খাবারের দোকানের একটি হাব, যাকে এখন সবাই স্ট্রিট ফুড জোন বলেই চেনে। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে ভিড়, ধোঁয়া আর খাবারের ঘ্রাণে জায়গাটা যেন আলাদা এক আমেজ পায়। নানা বয়সের মানুষের আড্ডা জমে এখানে।
এই স্ট্রিট ফুড জোনেরই একটি ছোট কার্টে দেখা মিলল মুংডির। একটার পর একটা বাটি পরিবেশন হচ্ছে। দুটি ধরনে বিক্রি হচ্ছে খাবারটি—একটি চিকেন মুংডি, আরেকটি স্পেশাল চিকেন মুংডি। নামের পার্থক্যের সঙ্গে সঙ্গে উপকরণেও আছে সামান্য তফাৎ।
মুংডি তৈরির প্রক্রিয়াটা খুবই সাদামাটা। একদম সরু নুডলস নানা পদের মসলা দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। বিশেষ ধরনের সরু এই নুডুলসটিকে রাইস নুডুলস বলা হয়। এরপর ঝুরা করা মুরগির মাংস আর শুটকি সেদ্ধ করা পানির ভেতর সেই নুডলস ছেড়ে দেওয়া হয়। এই তরলটাই আসলে মুংডির প্রাণ, যাকে বলা হয় ব্রথ। হালকা, উষ্ণ আর মসলার গন্ধে ভরা এই ব্রথের মধ্যেই ধীরে ধীরে মিশে যায় সব স্বাদ। সঙ্গে দেওয়া হয় সেদ্ধ ডিম, ধনেপাতা, লেবু।
পরিবেশনের সময় আবার ওপর থেকে দেওয়া হয় সেদ্ধ করা একেবারে কুচি কুচি ঝুরা মাংস আর শুটকি। খুব বেশি বাহারি কিছু নয়, কিন্তু চামচে তুলে মুখে নিলেই বোঝা যায়, এই সাধারণ খাবারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পাহাড়ি জীবনের স্বাদ, আর সেই স্বাদই এখন জায়গা করে নিচ্ছে ঢাকার স্ট্রিট ফুডের ভিড়ে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আগারগাঁওয়ে পথের ধারের খাবারের পসরাতেও আপনার চোখে পড়বে পাহাড়ি জনপদের বিশেষ এই খাবারের চল। বাটি প্রতি মুংডির দাম রাখা হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকা, তবে মিরপুরের সিএচটি কালিনারি কিংবা হেবাংয়ের মতো সুপরিচিত পাহাড়ি খাবারের দোকানে দামটা কিছুটা বেশি পড়বে।
পুষ্টির দিক থেকেও মুংডির গুরুত্ব আছে। নুডলস থেকে শর্করা, শুটকি বা মাংস থেকে প্রোটিন এবং মসলার কারণে হালকা উষ্ণতা দেওয়া এই খাবার পাহাড়ি মানুষের দৈনন্দিন পরিশ্রমের সঙ্গে মানানসই। সহজে হজম হয় বলে অসুস্থতা বা দুর্বলতার সময়ও মুংডি খাওয়ার প্রচলন আছে।
তবে মুংডির আদি এক রন্ধন প্রণালী আছে, যে সম্পর্কে জানিয়েছেন প্রিয়তা ত্রিপুরা। মুংডি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। প্রথমে পরিষ্কার চাল কয়েক দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর সেই চাল পিষে ঘন মণ্ড তৈরি করা হয়। এই মণ্ড ফোটানো গরম পানিতে সেদ্ধ করার পর একটি বিশেষ ধরনের চালুনি বা ছাঁকনিতে ঢেলে চাপ দেওয়া হয়। তখন মণ্ড সুতার মতো সরু ও লম্বা আকারে বেরিয়ে আসে। এভাবেই তৈরি হয় মুংডির মূল অংশ।
এরপর সেই লম্বা সুতোসদৃশ চালের অংশগুলো আবার গরম পানিতে সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ হয়ে গেলে তাতে যোগ করা হয় তেল, গোলমরিচ ও চিংড়ি শুঁটকির গুঁড়া। এসব উপকরণ মিশে মুংডির স্বাদ তৈরি করে, যা একদিকে হালকা আবার অন্যদিকে টক ও ঝাল অনুভূতি দেয়।
টক ঝাল মুংডির স্বাদ সাধারণ নুডলসের মতো নয়। এর গন্ধ ও ঝোলের স্বাদে চিংড়ি শুঁটকির প্রভাব স্পষ্ট থাকে। এই বৈশিষ্ট্যই মুংডিকে আলাদা করে চেনায় এবং পাহাড়ি খাবারের স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়।
এই স্বাদের সঙ্গে আমি মিল পেয়েছি থুকপার। অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার আগে ও পরে নেপালের নানা দোকানে আমি থুকপা খেয়েছিলাম।
মুংডির তুলনায় থুকপার ঝোল কিছুটা ভারি ও বেশি মসলাদার হয়ে থাকে। থুকপায় থাকে নানা ধরনের সবজি, যেমন: বাঁধাকপি, গাজর, পেঁয়াজপাতা, সঙ্গে মুরগি, গরু বা কখনো ইয়াকের মাংস। শীতকালে গা গরম রাখা ও শক্তি জোগানোর জন্য এই খাবারটি খুব জনপ্রিয়।


