প্যারেন্টিং

শিশুকে ‘না’ বলবেন না, তাহলে কীভাবে বলবেন

রবিউল কমল
রবিউল কমল

শিশুকে সামলাতে গিয়ে বাবা-মায়ের মুখে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি শোনা যায়, সেটি সম্ভবত ‘না’। এটা করো না, ওটা ধরো না, ওখানে যেও না; সারাদিন যেন শিশুকে ‘না’ বলেই যেতে হয়। কিন্তু সব সময় ‘না’ বলা কি সত্যিই কাজে দেয়?

কিডজলিডজ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের আরলি চাইল্ডহুড এডুকেশন কনসালটেন্ট লীনা ফেরদৌসের মতে, বারবার ‘না’ শুনতে শুনতে শিশুর কাছে শব্দটির গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তাই বিপজ্জনক পরিস্থিতি ছাড়া ছোটখাটো বিষয়ে শুধু ‘না’ বলে, শিশুকে কী করা উচিত সেটি সহজ করে বোঝানো ভালো।

ধরা যাক, শিশু মিষ্টি খেতে চাইছে। তখন ‘না, মিষ্টি খাবে না’ বলার বদলে তার হাতে দই, ফল বা অন্য কোনো পছন্দের খাবার তুলে দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশুর চাওয়াটাও একেবারে উপেক্ষা করা হয় না, আবার ভালো একটি বিকল্পও দেওয়া হয়।

তবে খাবারকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে ভাগ না করাই ভালো। বরং শিশুকে বোঝানো যায়, কোন খাবার শরীরকে বেশি শক্তি দেয় এবং কোন খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

Page 3 | 2d illustration childrens book Images - Free Download on Magnific  (formerly Freepik)

খাবার ছুড়ে ফেললে

অনেক ছোট শিশু পেট ভরে গেলে খাবার নিয়ে খেলতে শুরু করে। কেউ আবার হাতের বাটি মেঝেতে ছুড়ে ফেলে। এমন হলে চিৎকার না করে শান্তভাবে বাটিটি সরিয়ে নিন। তারপর বলুন, ‘খাবার খাওয়ার জন্য, ছুড়ে ফেলার জন্য নয়।’

শিশু বিছানায় লাফালাফি করলেও একইভাবে বোঝাতে পারেন, ‘বিছানা ঘুম আর বিশ্রামের জন্য, লাফানোর জন্য নয়।’
আর শিশু যখন ভালো আচরণ করবে, তখন তার প্রশংসা করুন। এতে সে বুঝতে পারবে কোন আচরণটি আপনি পছন্দ করছেন।

অন্যের খেলনা ভেঙে ফেললে

ভাই-বোনের খেলনা বা লেগো দিয়ে বানানো কিছু ভেঙে ফেললেই যে শিশু ঈর্ষা থেকে কাজটি করছে, তা নয়। অনেক সময় কৌতূহল থেকেই সে খেলনাটি ভেঙে দেখতে চাইতে পারে।

এমন হলে বকাঝকা না করে তার সঙ্গে খেলায় যোগ দিতে পারেন। অন্যের খেলনা কীভাবে যত্ন করে ব্যবহার করতে হয়, নিজের আচরণের মাধ্যমে সেটি দেখিয়ে দিন।

Bedtime Vectors - Download Free High-Quality Vectors | Magnific (formerly  Freepik)

প্রাণীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করলে

শিশু যদি পোষা প্রাণীর লেজ ধরে টানে, তখন তাকে বোঝান প্রাণীরও যত্ন প্রয়োজন। বলতে পারেন, ‘বিড়ালের লেজ টান দিলে ওর ব্যথা লাগে।’ এভাবে বোঝালে শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে অন্যের প্রতি মায়া ও সহানুভূতি তৈরি হবে।

কাউকে মারলে

শিশু রেগে গিয়ে ভাই-বোন বা অন্য কোনো শিশুকে মারতে পারে। তখন শুধু ‘মারবে না’ বললেই সব সময় কাজ হয় না।
প্রথমে শিশুটিকে থামান। তারপর শান্তভাবে বলুন, ‘রাগ হলেও কাউকে মারতে হয় না।’

এরপর কেন সে রেগেছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। হয়তো সে কোনো খেলনা চেয়েছে বা কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়েছে। তার অনুভূতিটা বুঝতে সাহায্য করুন এবং কীভাবে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা যায়, সেটি শেখান।

আবদার করতে গিয়ে কান্না করলে

শিশু নিজের কথা ঠিকমতো বলতে না পারলে অনেক সময় কান্নাকাটি করে কিছু চাইতে পারে।

তখন ‘কান্না বন্ধ করো’ না বলে বলতে পারেন, ‘তুমি একটু ধীরে ধীরে বলো, তাহলে আমি বুঝতে পারব।’

এতে শিশু ধীরে ধীরে নিজের চাওয়া ও অনুভূতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে শিখবে।

Children illustration Images - Free Download on Magnific (formerly Freepik)

দুষ্টুমি করে কিছু নষ্ট করলে

শিশু খুব জেদি বা বিরক্ত হয়ে গেলে সব সময় রাগ দেখানো দরকার নেই। কখনো কখনো একটু হাসি-ঠাট্টাও কাজে দেয়।

যেমন, শিশু ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে দুষ্টুমি করলে মজা করে বলা যায়, ‘এই যে, আমি কিন্তু সব দেখছি।’

তারপর তাকে অন্য কোনো খেলায় ব্যস্ত করে দিতে পারেন। শিশুর মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া অনেক সময় জোর করে থামানোর চেয়ে ভালো কাজ করে।

মোবাইল ফোন নিতে চাইলে

আপনি ফোন হাতে নিলেই শিশু সেটি নিতে চাইতে পারে। কিন্তু ফোন তো শিশুর খেলনা নয়।

তাই ‘ফোন নেবে না’ বলার বদলে তার হাতে অন্য কোনো নিরাপদ খেলনা তুলে দিন। ছোট বল, গাড়ি বা অন্য কোনো খেলনা দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে।

শিশুর কোনো আচরণ শুধু বন্ধ করে দেওয়ার চেয়ে তার বদলে কী করা যায়, সেটি দেখানো অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়।

To Be, or Not to Be: An Only Child's Dilemma - Ripple Foundation Wave Blog

জুতা খুলতে চাইলে

বাইরে বা এমন কোনো জায়গায় যেখানে জুতা খুললে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু সেখানে শিশু জুতা খুলতে চাইলে বলুন, ‘জুতা পরে থাকো। আমরা বাড়িতে গিয়ে জুতা খুলব।’

শিশু চেয়ারে উঠে দাঁড়ালেও শুধু ‘উঠো না’ না বলে বলতে পারেন, ‘চেয়ারে আমরা বসি।’ অর্থাৎ, কী করা যাবে না বলার পাশাপাশি কী করা উচিত, সেটিও তাকে জানান।

বিপজ্জনক কিছু করতে গেলে

তবে বিপদের সময় নিয়ম আলাদা। শিশু যদি চুলা, আগুন, বৈদ্যুতিক তার বা অন্য কোনো বিপজ্জনক জিনিসের দিকে এগিয়ে যায়, তখন দ্রুত ও জোরালোভাবে তাকে থামাতে হবে।

এ সময় স্পষ্ট করে বলতে পারেন, ‘গরম!’ ‘বিপদ!’ বা ‘থামো!’ একই সঙ্গে শিশুকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে।

লীনা ফেরদৌসের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কণ্ঠস্বর ও মুখের অভিব্যক্তিতেও বিপদের বিষয়টি বোঝানো জরুরি।

Kids illustration Images - Free Download on Magnific (formerly Freepik)

তাহলে ‘না’ কখন বলবেন

লীনা ফেরদৌস বলেন, শিশুকে ‘না’ বলা যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। বরং যেখানে সত্যিই সীমা তৈরি করা দরকার বা বিপদের আশঙ্কা আছে, সেখানে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলাই জরুরি।

তবে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে কেবল ‘না’ বলে শিশুর কী করা উচিত, সেটি সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা বেশি কার্যকর হতে পারে।

তিনি মন্তব্য করেন, শিশুতো এক দিনে সবকিছু শিখে যায় না। ধৈর্য, ভালোবাসা ও বারবার বুঝিয়ে বলার মধ্য দিয়েই সে ধীরে ধীরে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।