এক্সপ্লেইনার

সাইবার জগতে বট ট্রাফিক: ভবিষ্যদ্বাণীর দেড় বছর আগেই যেভাবে ছাড়িয়ে গেল মানুষকে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ধরুন, এই গরমে আপনি অনলাইনে এসি কেনার জন্য কয়েকটি ওয়েবসাইট ঘুরে দেখছেন। আপনি মানুষ, তাই খুব বেশি হলে ৫ থেকে ১০টি সাইট ঘেঁটে দাম যাচাই করবেন। কিন্তু আপনি যেসময়ে ওই সাইটগুলো দেখলেন, সেসময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বট ঘুরে ফেলেছে কয়েক হাজার সাইট।

এসব বট সেকেন্ডে কতটি ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারবে জানেন? উত্তর হলো—কমপক্ষে এক হাজার থেকে ১০ হাজার।

অনলাইনে এআই বা মেশিনের এই অতিমানবীয় গতির কারণেই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ঘটে গেছে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটে মোট ট্রাফিক বা ভিজিটরের সংখ্যায় মানুষকে ছাড়িয়ে গেছে স্বয়ংক্রিয় ‘বট’ বা মেশিন। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আপনি এখন যে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, সেখানে মানুষের চেয়ে রোবট বা বটের চলাচলই বেশি।

ইন্টারনেট নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিষয়ক বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স সম্প্রতি এই তথ্য সামনে এনেছেন। এ নিয়ে শুক্রবার মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

কী বলছে পরিসংখ্যান

ক্লাউডফ্লেয়ারের রাডার ড্যাশবোর্ডের লাইভ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইন্টারনেটের (এইচটিএমএল কনটেন্টে) মোট ট্রাফিকের ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশই তৈরি করছে বট বা মেশিন। আর মানুষ বা হিউম্যান ট্রাফিক মাত্র ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।

ক্লাউডফ্লেয়ারের রাডার ড্যাশবোর্ডের পরিসংখ্যান। ছবি: সংগৃহীত

যা জানালেন ম্যাথিউ প্রিন্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রযুক্তিবিদ ম্যাথিউ প্রিন্স লিখেছেন, ‘ইন্টারনেটের ইতিহাসে এই প্রথম স্বয়ংক্রিয় বট থেকে আসা ট্রাফিক মানুষের তৈরি ট্রাফিককে ছাড়িয়ে গেছে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘স্বয়ংক্রিয় বট ট্রাফিক এমন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে, যা এই খাতের কেউ এত দ্রুত আশা করেনি।’

এর আগে ম্যাথিউ প্রিন্স ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বট মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেছে প্রায় দেড় বছর আগেই।

 

মূল কারণ কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন সার্চ ইঞ্জিনের পুরোনো আমলের ক্রলার বা ডেটা চোর (ওয়েব স্ক্র্যাপার) বটের কারণে হয়নি। এর পেছনে কাজ করছে নতুন প্রজন্মের ‘এজেন্টিক এআই’।

এসব এআই এজেন্ট মানুষের হয়ে বিচরণ করে সাইবার জগতে। সময় বাঁচিয়ে আপনাকে তথ্য খুজে দেয়। আপনার হয়ে অতি অল্প সময়ে আপনার পছন্দের ও দামের রেঞ্জের এসি কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তার তালিকা হাজির করে।

এজেন্টিক এআই কী

এটি এমন এক উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা কেবল তথ্য খোঁজে না বরং মানুষের সহকারী বা ‘এজেন্ট’ হয়ে নিজে নিজে অনলাইনে কাজ করে দেয়। শুধু আপনার জন্য তথ্য খুঁজে দেওয়াই নয়, টিকিট বুকিং করা, শপিং সাইট থেকে সেরা ডিল খুঁজে বের করাসহ নানা ধরনের কাজ করে দেয়।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান সিকিউরিটি’-এর ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মানুষের তুলনায় এআইচালিত ট্রাফিক আট গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিকের মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল এআই এজেন্টভিত্তিক। বছরের শেষে এই ট্রাফিক প্রায় ৮ হাজার শতাংশ বেড়ে গেছে।

সংগৃহীত গ্রাফিক্স

এজেন্টিক এআই বা বট কেন ঝুঁকিপূর্ণ

ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আজকের যে ইন্টারনেট ব্যবস্থা তা ডিজাইন করা হয়েছিল মানুষের মনোযোগ ও ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে। পুরো ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, অনলাইন কেনাকাটা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ওয়েবসাইটের আয়সহ পুরো ই-কমার্স মডেলটি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের ওপর ভিত্তি করে। এখানে সবকিছুর ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয় যে ব্যবহারকারী একজন মানুষ।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবহারকারী বট হতে পারে—এমন সম্ভাবনাই বাড়ছে।

ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইম্পারভা’ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটির এ বছরের ‘ব্যাড বট’ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব কোম্পানি এখনো ভাবছে তাদের ব্যবহারকারীরা সবাই মানুষ, তারা নিজেদের সিস্টেম বুঝতে ভুল করছে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নামে পরিচিত কিছু বিনিয়োগকারী দ্রুত বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্টার্টআপ ও প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে এবং বিনিময়ে মালিকানার শেয়ার নেয়।

এসব বড় বিনিয়োগকারীদের পুরো অনলাইন বাজার ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে ইম্পারভা।

এর কারণ হলো বর্তমানে সব অনলাইন মিডিয়া, ই-কমার্স ও ব্র্যান্ডগুলোতে মানুষের চেয়ে বটের চলাচলই বেশি। তাই বিনিয়োগ আসলে কার জন্য করা হচ্ছে—মানুষ নাকি বট, তা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

সংগৃহীত গ্রাফিক্স

ঝুঁকিতে কারা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপন ও অনলাইন বিপণন খাত সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা এআই বট যখন আপনার হয়ে এক সেকেন্ডে পাঁচ হাজার ওয়েবসাইট ঘুরে আসবে, তখন সেখানে একটিও ‘হিউম্যান ভিউ’ বা মানুষের ইম্প্রেশন তৈরি হবে না।

ফলে বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় পেজভিউ বা ক্লিকের ওপর ভিত্তি করে আয়ের যে মডেল তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

এআই এজেন্ট বা বটের কারণে ওয়েবসাইটে ভিজিটরের সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবে দেখা যাবে—পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। কারণ মেশিন ভিজিট করলেও বিজ্ঞাপন দেখে পণ্য কেনে না।

এর ফলে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারে ব্যবহৃত বিভিন্ন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুনরায় বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৩ সালের ৬ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দর্শকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্রিটিশ নির্মাতা ইঞ্জিনিয়ার্ড আর্টস-এর তৈরি মানুষের আকৃতির রোবট ‘আমেকা’। ছবি: সংগৃহীত

যেসব চ্যালেঞ্জে নিরাপত্তা ব্যবস্থা

সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইম্পারভার গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে এআইচালিত বট হামলা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৫ গুণ বেড়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৪০ শতাংশই ক্ষতিকর বা ম্যালিশিয়াস বটের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বৈধ এআই এজেন্ট এবং ক্ষতিকর বটের আচরণ অনেক ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম। ফলে কোনটি উপকারী আর কোনটি ক্ষতিকর—তা শনাক্ত করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান সিকিউরিটি’-এর তথ্য মতে, মানুষ ও ক্ষতিকর স্বয়ংক্রিয় বটের মধ্যে পার্থক্য মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

ফলে এটি মানুষ নাকি বট—শনাক্ত করার যে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তা ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে গেছে।

সমাধান

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ইন্টারনেটে মানুষ ও যন্ত্র—দুই ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা পরিচয় ও যাচাই ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

এআই এজেন্ট বা বটকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যাবে না। এর বদলে তাদের পরিচয় যাচাই, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

যারা মেশিনের পরিচয় যাচাই ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে নতুন নিরাপত্তা দেয়াল তৈরি করতে পারবে, প্রযুক্তি দুনিয়ার ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই থাকবে।