হরমুজ প্রণালি প্রস্তাবে কী ছিল, কেন ভেটো দিলো চীন-রাশিয়া?
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল সুরক্ষিত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা একটি খসড়া প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে চীন ও রাশিয়া।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবারের ভোটে বাহরাইনের আনা প্রস্তাবটির পক্ষে ১৫ সদস্যের পরিষদে ১১টি ভোট পড়ে। তবে দুই স্থায়ী সদস্যের বিরোধিতায় এটি বাতিল হয়ে যায়। অপর দুটি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের চার ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে যায়। মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর এই সংকট শুরু হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তেজনার জেরে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ-মাইন বসায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এতে চলাচল ব্যাহত হতে শুরু করে। পরে তারা তাদের দৃষ্টিতে ‘অ-শত্রুভাবাপন্ন’ জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেয়। তবুও এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য সরবরাহকে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহরাইন, জর্ডান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অন্যান্য দেশ মিলে প্রস্তাবটি আনে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য প্রণালিটি সচল রাখা কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে একটি বহুজাতিক নৌ জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যও প্রণালিটি সচল রাখতে ৪০টি দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রস্তাবে কী ছিল? কেন রাশিয়া ও চীন এতে ভেটো দিল?
প্রস্তাবে যা ছিল
নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, খসড়া প্রস্তাবে জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায় যুক্ত করে প্রণালিতে নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সামরিক পদক্ষেপও ছিল।
এছাড়া নৌ চলাচলে বাধা দিলে সংশ্লিষ্টদের ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায় এমন একটি বিধান, যা প্রয়োজনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে।
চীন ও রাশিয়ার ভেটোর মূল কারণ
চীন ও রাশিয়া শুরু থেকেই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছিল। প্রতিবেদনে তাদের আপত্তির তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
অবাধ সামরিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা
চীন ও রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবে সপ্তম অধ্যায়ের প্রয়োগ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে স্পষ্ট সীমা ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেবে। পরে সমালোচনার মুখে খসড়া থেকে এই অধ্যায়ের সরাসরি উল্লেখ বাদ দেওয়া হলেও দেশ দুটি মনে করে, এতে সামরিক হস্তক্ষেপের পথ খোলা থাকে।
একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি
তাদের মতে, প্রস্তাবটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মূল কারণ—মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা উপেক্ষা করেছে। এতে শুধু ইরানের পদক্ষেপকে হুমকি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা আরোপ
নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও চীন ও রাশিয়ার আপত্তি ছিল। তাদের মতে, এতে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তারা যুক্তি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হলে তেলের দামে বড় প্রভাব পড়ে। প্রস্তাব পাস হয়ে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা আছে। এতে বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে।
ভবিষ্যতের রূপরেখা
চীন ও রাশিয়ার এই ভেটো হরমুজ প্রণালিতে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপের আইনি পথ বন্ধ করেছে। তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান দেয়নি।
বর্তমানে লেবানন ও ইরানসহ ওই অঞ্চলে হামলা ও পাল্টা হামলা চলছেই। মানবিক সংকটও বাড়ছে। পরাশক্তিগুলোর এই কূটনৈতিক বিভাজন দেখাচ্ছে, সংকটের মূল কারণ এড়িয়ে একপাক্ষিক পদক্ষেপ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরানো কঠিন।