হাতি দিবস

কোন মহাদেশের হাতি, কান দেখে যায় চেনা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

হাতি কেবল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী নয়, তারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, আবেগপ্রবণ ও সামাজিক প্রাণী। হাতির স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। আনন্দ, দুঃখ, শোক, সহমর্মিতাসহ বিভিন্ন ধরনের অনুভূতিও তারা প্রকাশ করতে পারে। পরিবার ও দলের সদস্যদের প্রতি তাদের টানও বেশ শক্তিশালী।

এসব কারণেই হাতি নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু এই প্রাণীটি আজ নানা বিপদের মুখে। প্রতি বছর অসংখ্য হাতিকে কেবল তার দাঁতের জন্য হত্যা করা হয়। শিকারিরা হাতিকে মেরে তার দাঁত নিয়ে যায়।

হাতিকে নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে প্রতি বছর ১২ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। এই দিনটির উদ্দেশ্য হলো হাতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো, তাদের ওপর থাকা নানা হুমকির কথা তুলে ধরা এবং কীভাবে তাদের রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা।

ছবি: রয়টার্স

বিশ্ব হাতি দিবসের উদ্যোগ শুরু হয় ২০১১ সালে। কানাডিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস এবং থাইল্যান্ডের এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই উদ্যোগ নেয়। প্রথম বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয় ২০১২ সালের ১২ আগস্ট। উদ্যোগটির প্রতি সমর্থন জানান অভিনেতা ও স্টার ট্রেক তারকা উইলিয়াম শ্যাটনার। তিনি রিটার্ন টু দ্য ফরেস্ট নামের একটি তথ্যচিত্রে বর্ণনাও দেন। তথ্যচিত্রটিতে বন্দিদশায় থাকা এশীয় হাতিদের আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়।

বিশ্ব হাতি দিবসের মূল লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বের মানুষের কাছে হাতিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা। কারণ, ভালো স্বভাব ও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার জন্য হাতি পৃথিবীর মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হলেও তাদের অস্তিত্ব এখন নানা হুমকির মুখে।

দুঃখজনক হলেও অনেক ক্ষেত্রে হাতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো মানুষ। কারণ হাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি অবৈধ শিকার। বিশেষ করে দাঁতের জন্য বহু হাতিকে হত্যা করা হয়। তাদের দাঁতের চাহিদা বেশি থাকায় এটি শিকারিদের কাছে লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার কিছু দরিদ্র অঞ্চলে একটি হাতির দাঁত বিক্রি করে একজন শিকারি অনেক টাকা আয় করতে পারে। অন্যদিকে যেসব দেশে হাতির দাঁতের চাহিদা বেশি, সেখানে এর দাম আরও বেশি। ফলে হাতির জন্য বিপদ আরও বাড়ে।

ছবি: রয়টার্স

কেবল শিকার নয়, বাসস্থান হারানোও হাতির জন্য বড় সমস্যা। মানুষ নতুন শহর, রাস্তা, কৃষিজমি ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরি করতে গিয়ে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ঢুকে পড়ছে। ফলে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতও বাড়ছে। কারণ অনেক সময় খাবারের খোঁজে হাতি মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ে।

গবেষকদের মতে, বন্য হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণই হলো তাদের বাসস্থান ধ্বংস হওয়া। একসময় পৃথিবীর বনে প্রায় এক কোটি ২০ লাখের বেশি হাতি ছিল বলে ধারণা করা হয়। এখন বন্য হাতির সংখ্যা কয়েক লাখে নেমে এসেছে। প্রতি বছর হাজার হাজার হাতি অবৈধ শিকারের শিকার হয়।

হাতির বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাদের স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। তারা দীর্ঘদিন পরেও পরিচিত হাতি, মানুষ কিংবা জায়গা চিনতে পারে। হাতিদের মধ্যে পরিবারকেন্দ্রিক জীবনও দেখা যায়। তারা দলবদ্ধভাবে থাকে এবং বিপদে একে অন্যকে সাহায্য করে।

কোনো হাতি মারা গেলে অন্য হাতিদের তার মরদেহর কাছে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তারা মৃত সঙ্গীর প্রতি বিশেষ আচরণও করে। তাদের মধ্যে সহমর্মিতার আচরণও দেখা যায়। দলের কোনো সদস্য আহত হলে অন্য হাতিরা তার পাশে থাকে, তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে।

ছবি: রয়টার্স

হাতিদের রক্ষা করতে একসঙ্গে অনেক ধরনের উদ্যোগ দরকার। প্রথমত, তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা করতে হবে। বন ও তৃণভূমি ধ্বংস না করে মানুষের বসতি ও উন্নয়ন এমনভাবে করতে হবে, যেন হাতিদের চলাচলের জায়গা থাকে।

এশীয় হাতির সংখ্যা আফ্রিকান হাতির তুলনায় অনেক কম। পর্যটনশিল্পের কিছু নিষ্ঠুর কার্যক্রমও তাদের জন্য বড় সমস্যা। কোথাও মানুষ হাতির পিঠে চড়ে, আবার কোথাও হাতিকে দিয়ে নানা ধরনের প্রদর্শনী করানো হয়। এসবের পেছনে অনেক সময় হাতিদের ওপর দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও নির্যাতন জড়িয়ে থাকে।

তাই হাতিদের রক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে নিরাপদে বাঁচতে দেওয়া। হাতিকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।

হাতি সম্পর্কে সাতটি তথ্য

হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী। তাদের বিশাল শরীর, লম্বা শুঁড় আর বড় বড় কান দেখলেই চেনা যায়। কিন্তু এই শান্ত-সুন্দর প্রাণীদের সম্পর্কে এমন অনেক মজার তথ্য আছে, যা হয়তো আপনি জানেন না। চলুন জেনে নেওয়া যাক হাতি সম্পর্কে সাতটি তথ্য।

পৃথিবীতে হাতির তিনটি প্রজাতি আছে

বর্তমানে পৃথিবীতে হাতির তিনটি প্রজাতি রয়েছে, আফ্রিকান সাভানা হাতি, আফ্রিকান বন্য হাতি ও এশীয় হাতি। বড় কান, হাতির দাঁত বা শুঁড় দেখে সহজেই চেনা যায়। তবে প্রজাতিভেদে তাদের চেহারা ও আকারে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী

হাতির চেয়ে বড় কোনো স্থলচর প্রাণী পৃথিবীতে নেই। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ আফ্রিকান হাতি প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং তার ওজন হতে পারে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার কেজি।

এশীয় হাতি তুলনামূলকভাবে একটু ছোট। তারা প্রায় ২ দশমিক ৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং ওজন হতে পারে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার কেজি।

কান দেখে বোঝা যায় আফ্রিকান না এশীয়

আফ্রিকান ও এশীয় হাতিকে আলাদা করার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো তাদের কান। আফ্রিকান হাতির কান অনেক বড় এবং দেখতে অনেকটা আফ্রিকা মহাদেশের মানচিত্রের মতো।

অন্যদিকে এশীয় হাতির কান তুলনামূলকভাবে ছোট এবং দেখতে অনেকটা ভারতের মানচিত্রের মতো।

হাতির দাঁত সারাজীবন বাড়তে থাকে

হাতির দাঁত কেবল শক্তিশালী অঙ্গ নয়, তার বয়স সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে। হাতির দাঁত সারা জীবন বাড়তে থাকে। তাই খুব বড় দাঁত দেখে বোঝা যেতে পারে যে হাতিটি বেশ বয়স্ক।

আফ্রিকান পুরুষ ও স্ত্রী দুই ধরনের হাতিরই দাঁত থাকতে পারে। কিন্তু এশীয় হাতির ক্ষেত্রে সাধারণত শুধু পুরুষ হাতিরই বড় দাঁত গজায়। তাই বড় দাঁত নেই এমন পূর্ণবয়স্ক এশীয় হাতি সম্ভবত একটি স্ত্রী হাতি।

আফ্রিকান বন্য হাতি আলাদা একটি প্রজাতি

আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, আফ্রিকান বন্য হাতি আসলে আফ্রিকান হাতিরই একটি উপপ্রজাতি। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকান বন্য হাতি আলাদা একটি প্রজাতি। এই হাতিগুলো মূলত আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে বাস করে। সাভানা হাতির তুলনায় তাদের কান কিছুটা গোল এবং দাঁতও তুলনামূলক সোজা।

দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা খাবার খায়

হাতির বিশাল শরীর চালাতে প্রচুর খাবার প্রয়োজন। তাই তারা দিনের ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার খেয়ে কাটাতে পারে! তারা ঘাস, বিভিন্ন গাছের পাতা, উদ্ভিদ ও ফল খায়। খাবারের গন্ধ শুঁড় দিয়ে শনাক্ত করে। এরপর শুঁড় দিয়ে খাবার তুলে মুখে নেয়। অর্থাৎ হাতির শুঁড় কেবল নাক নয়, একই সঙ্গে খাবার ধরার জন্যও দারুণ কাজে লাগে!

রোদ থেকে নিজেকে রক্ষার উপায়

প্রচণ্ড রোদে আমাদের যেমন সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হয়, হাতিরাও রোদ থেকে নিজেদের ত্বক রক্ষা করার একটি বুদ্ধিমান উপায় জানে। নদী বা জলাভূমিতে গোসল করার পর তারা শরীরের ওপর কাদা ও বালি ছুড়ে দেয়। এই কাদা ও বালির স্তর তাদের ত্বককে তীব্র রোদ থেকে কিছুটা রক্ষা করে।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডে’জ অব দ্য ইয়ার