নরসিংদীতে কাঠ পুড়িয়ে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা
গ্যাসের তীব্র সংকট এবং ঝুটের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে নরসিংদীর অন্তত ১০০টি ছোট-বড় টেক্সটাইল কারখানা সচল রাখা হচ্ছে। এতে দেখা দিচ্ছে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি ।
এর মধ্যে অন্তত ৫০টি কারখানা সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কারণে আংশিক উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে, আর বাকি ৫০টি কারখানা ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করছে।
এ ছাড়া, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে জেলার ১০০টিরও বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাহত হয়েছে। গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসায় কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন এবং মিল মালিকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাস সংকটের মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি কারখানা উৎপাদন সচল রাখতে কাঠ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এটি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না।
আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন আরও বলেন, পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো উচিত।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ বদরুল হুদা জানান, জেলার প্রায় ৫০টি কারখানা জ্বালানি হিসেবে ঝুট ব্যবহার করে, কিন্তু তাদের জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের অনুমতি নেই।
তিনি বলেন, ‘পরিবেশ আইন অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো গাছ কাটার জন্য বন বিভাগের অনুমতির প্রয়োজন হয়। বাস্তবে এসব আইন মানা হচ্ছে না, যার ফলে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে সম্প্রতি কারখানাগুলো জ্বালানি কাঠের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে কি না, তা আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।’
গত শনিবার চৌয়ালা শিল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখতে পান, হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইলের কর্মীরা স্টিম বয়লারে কাঠ পোড়াচ্ছেন।
হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটরদের একজন মো. সাখাওয়াত। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বয়লার চালাতে ঝুট ব্যবহার করতাম। কিন্তু ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আমরা কাঠ পোড়াচ্ছি।’
সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণকারী সাইজিং মিলগুলো স্টিম বয়লার চালানোর জন্য কাঠ ব্যবহার করছে। মো. সাখাওয়াত জানান, প্রতিটি কারখানায় প্রতিদিন ১২ হাজার টাকার বেশি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক কাউসার হোসেন বলেন, ‘পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আমরা জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি। গ্যাস সংকটের কারণে আমরা উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পারছি না, ফলে ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল করতে হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, টিকে থাকার জন্য কেবল জেলা শহরেই প্রায় ৩০-৩৫টি কারখানা সম্প্রতি আবারও কাঠ ব্যবহার শুরু করেছে। পুরো জেলায় এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নরসিংদীতে ৩ হাজারেরও বেশি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি টেক্সটাইল, ডাইয়িং, সাইজিং, স্পিনিং এবং তৈরি পোশাক কারখানা। প্রায় ৪০০টি কারখানা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এবং স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য তাদের ১০-১৫ পিএসআই চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন।
তারা জানান, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে নরসিংদীতে গ্যাস সংকট শুরু হলেও গত পাঁচ দিনে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে ১০০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইয়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন, নরসিংদীর চেয়ারম্যান এবং মাধবদী ডাইয়িং ফিনিশিং মিলস লিমিটেডের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া লিটন বলেন, দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ মেটায় নরসিংদী।
তিনি বলেন, ‘এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে আমরা শ্রমিকদের বেতন, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল বা অন্যান্য খরচ পরিশোধ করতে পারব না। আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’
তিনি বলেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ প্রতিটি কারখানার ওপর হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার নির্ভরশীল।’
আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের এমডি আবদুল্লাহ আল মামুন আরও জানান, নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
মামুন বলেন, ‘মাস শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু কোনো কারখানা মালিকই শ্রমিকদের মজুরি, ব্যাংকের সুদ, ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে, যা বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করবে।’
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা এবং শিল্প ইউনিটে মাসিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, সংকটের কারণে তারা কারখানা মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেন না। তবে ‘আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে’ বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।