মনু ও ধলাই নদের বাঁধ ভেঙে মৌলভীবাজারে ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী

নিজস্ব সংবাদদাতা, মৌলভীবাজার

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদের বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে জেলাজুড়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ। সড়ক-কালভার্ট ভেঙে প্লাবিত এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

মারা যাওয়া ওই বৃদ্ধের নাম আশরাফ আলী ওরফে আশাই মিয়া (৭০)। তার বাড়ি রাজনগর উপজেলার আকুয়া গ্রামে। টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিন মিয়া জানান, গতকাল সকালে ভাঙ্গারহাট-আকুয়া এলাকায় বেড়িবাঁধের (রিং বাঁধ) কাছ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

ইউপি চেয়ারম্যান মতিন মিয়া বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।বন্যা

পাহাড়ি ঢলের কারণে রাজনগর উপজেলায় মনু নদের পানি বেড়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও হরিপাশা এলাকায় মনু নদের একটি সুরক্ষাবাঁধ ভেঙে যায়। এর ফলে উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহিমপুর, কাছারি, একামধু, কান্দিরকুল এবং পণ্ডিতনগরসহ অন্তত ২০টি গ্রামের হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। ঝুঁকিতে আছে রামভদ্রপুর, সালোন, পাইকপাড়া, দেফলুড়া, গণেশপুর, আকুয়া, কোনাগাঁও, তাগারপুর ও ভাঙ্গারহাটের মতো এলাকাগুলো।

কমলগঞ্জের আদমপুর গ্রামের বাসিন্দা ছাতির মিয়া জানান, বুধবার রাত ১০টার দিকে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মোখাবিল এলাকায় ধলাই নদের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের মোখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরিগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালারায়বিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেইতইগাঁও, ভানুবিল ও ঘোরামারা গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে পড়েন এসব গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার মানুষ।

টানা ভারী বৃষ্টির কারণে মাধবপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কে নূরজাহান চা-বাগানের ভেতরের গোয়ালবাড়ী এলাকার একটি কালভার্ট ভেঙে গেছে। অন্যদিকে আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

মোখাবিল এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, রাতের বেলা ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক আসবাব ও জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। এসব পরিবার এখন খাদ্যসংকটে পড়েছে।বন্যা ৩

জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘বাঁধটি হঠাৎ করেই ভেঙে যায় এবং হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করে। ওই সময় ঘর থেকে পরিবারকে নিরাপদে বের করে আনাই কঠিন ছিল। আশপাশের অনেক গ্রাম পানিতে তলিয়ে আছে, অথচ সরকারের ত্রাণসহায়তা এখনো সেভাবে পৌঁছায়নি।’

টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মো. ছানুর মিয়া বলেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা বাঁধ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর বাঁচানো যায়নি। বাঁধ ভেঙে বেশ কয়েকটি গ্রাম জলমগ্ন হয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওলীদ জানান, মনু নদের পানি রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে কমতে শুরু করলেও এখনো তা বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চাঁদনীঘাট পয়েন্টে মনু নদের পানি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং এটি বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। তবে শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি ধীরগতিতে বাড়লেও তা এখনো বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

মৌলভীবাজারের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলার ৪টি উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন এবং ৩টি পৌরসভা এখন বন্যাকবলিত। এতে ৯ হাজার ৯৯৮টি পরিবারের প্রায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৯৫৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

দুর্গত মানুষের জন্য কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তা এবং ৫ টন চাল বরাদ্দ করেছে। বন্যার কারণে জেলার ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১১টি মেডিকেল দল কাজ করছে বলে জানান তিনি।