‘কবরী হাসলেই দেশ হাসত’

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি সময়ের সফল নায়ক সোহেল রানা। দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর প্রযোজক তিনি। পরে ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নায়ক হিসেবে অভিষেক হয় তার। প্রথম সিনেমা ছিল সুপারহিট।

এরপর ‘এপার-ওপার’ সিনেমাসহ একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন তিনি। সেই সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘ভালোবাসার মূল্য কত...’ আজও অনেকের কণ্ঠে শোনা যায়।

নায়ক, পরিচালক, প্রযোজক সব পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে আজও তার প্রথম সিনেমার স্মৃতি অমলিন। ‘মাসুদ রানা’ সিনেমায় তার নায়িকা ছিলেন কবরী ও অলিভিয়া। প্রথম নায়িকা কবরীকে নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করেছেন সোহেল রানা।

কবরীর কথা উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘কবরীর তুলনা কবরীই। তার সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। তিনি ছিলেন এক ও অদ্বিতীয়। কবরী হাসলেই যেন পুরো দেশ হাসত। আমার প্রথম সিনেমার নায়িকা ছিলেন তিনি। পরে একসঙ্গে আরও কাজ করেছি, কিন্তু প্রথমবার পর্দা ভাগ করে নেওয়ার সেই স্মৃতি আজও ভোলার নয়।’

কবরীর জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে সোহেল রানা বলেন, ভাবুন তো, একজন নায়িকাকে সবাই ‘মিষ্টি মেয়ে’ বলে ডাকত! এই উপাধি কোনো পরিচালক, প্রযোজক বা সংগঠন দেয়নি। দিয়েছে দর্শক। মানুষের ভালোবাসা থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘মিষ্টি মেয়ে’। এটা একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সারা দেশের মানুষ তাকে এই নামেই চিনত, ডাকত।

প্রথম সিনেমাতে নায়িকা নির্বাচনের গল্পও শোনালেন তিনি।

‘ওরা ১১ জন প্রযোজনা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, আরেকটি সিনেমা বানাব। তখন কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা তুমুল জনপ্রিয়। কাজীদার সঙ্গে আলোচনা করে সিনেমার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি। পরিচালনা ও নায়ক—দুই দায়িত্বই নিই আমি।’
এরপর শুরু হয় শিল্পী নির্বাচন।

তার ভাষ্য, ‘‘সব শিল্পী আমি নিজেই নির্বাচন করেছিলাম। তখন কবরী ও অলিভিয়া দুজনই জনপ্রিয়। তাই দুজনকেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কবরীর সঙ্গে দেখা করে গল্প শোনালাম। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। তবে মজা করে বলেছিলেন, ‘পারভেজ সাহেব, আরেকজন নায়িকাও তো আছেন! তাকে আবার বেশি গুরুত্ব দেবেন না।’ কথাটা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠেছিলাম।সেইভাবেই কবরী আমার প্রথম সিনেমার নায়িকা হন।’’

কবরীর অভিনয়ের প্রশংসা করতে গিয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘তিনি অসাধারণ অভিনেত্রী ছিলেন। তার অভিনয় নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। হয়তো প্রচলিত সৌন্দর্যের সব মানদণ্ড তার মধ্যে ছিল না, কিন্তু তার মুখভরা ছিল মায়া। সেই মায়াই ছিল সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। অনেক রোদের পর যেমন এক পশলা বৃষ্টি মানুষকে স্বস্তি দেয়, কবরীও ঠিক তেমনই ছিলেন। পর্দায় তার উপস্থিতি দর্শকের মন জুড়িয়ে দিত।

কবরীর কাজের প্রতি নিষ্ঠার কথাও স্মরণ করেন সোহেল রানা।

‘শুটিংয়ে তিনি মাঝে মাঝে একটু দেরি করে আসতেন। তবে কাজ কখনো ঝুলিয়ে রাখতেন না। অভিনয়ের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সিরিয়াস। সেই নিষ্ঠাই তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কাজ জও বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলা সিনেমায় তার অবদান দর্শক চিরকাল মনে রাখবে,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘কবরী ছিলেন আনপ্যারালাল। তাকে দেখলেই মনে হতো, আমাদেরই একজন, ভীষণ কাছের মানুষ। সম্ভবত এ কারণেই দর্শক তাকে এত আপন করে নিয়েছিল। আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই তিনি যেন অন্য মানুষ হয়ে যেতেন। তার অভিনয়ের সেই জাদুই তাঁকে আজও অমর করে রেখেছে।’