‘গ্যালারিতে বসে সরাসরি মেসির খেলা দেখাটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে’
হাজার হাজার দর্শকের গর্জন। চারদিকে আকাশি-সাদা জার্সির ঢেউ। উৎসবের আমেজে মুখরিত স্টেডিয়াম। সেই জনসমুদ্রে বসে অপেক্ষা করছেন অভিনেত্রী নাদিয়া আহমেদ। তার চোখ শুধু একটি মানুষকে খুঁজছে—লিওনেল মেসি।
অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামলেন বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা। দর্শকসারিতে বসে নাদিয়া তখন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না—যাকে এতদিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছেন, সেই মেসিকে তিনি এবার দেখছেন একেবারে সামনে থেকে।
নাদিয়ার ভাষায়, ‘স্টেডিয়ামে বসে সরাসরি মেসির খেলা দেখাটা আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। কোনোদিন ভুলতে পারব না।’
দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী নাদিয়া আহমেদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এবারের বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো তিনি সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ পান। আর সেই ম্যাচটি ছিল তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা।
সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী অভিনেতা এফএস নাঈম।
ম্যাচ দেখার আনন্দের পেছনেও ছিল ছোটখাটো এক নাটকীয় গল্প।
নাদিয়া জানান, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল টিকিট সংগ্রহ করা। বিশ্বকাপের ম্যাচ হওয়ায় টিকিটের চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া।
‘টিকিট পাব কি পাব না, সেটা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলাম,’ বলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তার ছোট বোন নন্দিতা টিকিট সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লটারির মাধ্যমে টিকিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমবার ভাগ্য সহায় হয়নি। তবে দ্বিতীয়বার আবেদন করে কাঙ্ক্ষিত টিকিটটি পেয়ে যান।
‘টিকিট পাওয়ার খবর শোনার পর যে আনন্দ হয়েছিল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন,’ বলেন নাদিয়া।
ম্যাচের দিন স্টেডিয়াম এলাকায় পৌঁছেই অন্যরকম এক আবহ অনুভব করেন নাদিয়া।
ফিফার পরিবহনে করে যখন তিনি স্টেডিয়ামের কাছে পৌঁছান, তখন চারপাশে শুধু ফুটবলপ্রেমীদের ঢল। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছে প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে।
‘যেদিকে তাকিয়েছি, সেদিকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মনে হচ্ছিল পুরো স্টেডিয়ামটাই যেন আকাশি-সাদা রঙে রাঙানো,’ বলেন তিনি।
ষাট হাজারেরও বেশি দর্শকে পূর্ণ স্টেডিয়ামের পরিবেশকে তিনি তুলনা করেন এক বিশাল উৎসবের সঙ্গে।
‘ভেতরে ঢোকার সময় যে চিৎকার, উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা দেখেছি, তা আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল সবাই একসঙ্গে একটা স্বপ্নের অংশ হতে এসেছে।’
স্টেডিয়ামে বসার পর থেকে নাদিয়ার মনোযোগ ছিল এক জায়গাতেই।
‘আমার শুধু একটাই চিন্তা ছিল—কখন মেসিকে দেখব!’
অবশেষে ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে প্রবেশ করলেন আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা। তাদের মধ্যেই ছিলেন মেসি।
দূর থেকে হলেও নিজের চোখে মেসিকে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল তার কাছে অসাধারণ।
‘সরাসরি মেসিকে দেখার পর ভেতরে অন্যরকম একটা উচ্ছ্বাস কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, এতদিনের একটা স্বপ্ন পূরণ হলো।’
মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নাদিয়া।
তিনি বলেন, ‘এত বড় একজন তারকা খেলোয়াড়কে সামনে থেকে খেলা দেখতে পারাটা সত্যিই বিশেষ কিছু। তার প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি মুভমেন্ট দর্শকদের মধ্যে অন্যরকম উত্তেজনা তৈরি করছিল।’
মেসির গোল ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্টেডিয়ামের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
‘আমার ভেতরে তখন কী পরিমাণ আনন্দ কাজ করছিল, সেটা ভাষায় বোঝানো কঠিন। আমি শুধু উপভোগ করেছি।’
আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা অবশ্য নতুন নয় নাদিয়ার।
শৈশব থেকেই তিনি আর্জেন্টিনা সমর্থন করেন। সেই ভালোবাসার পেছনেও রয়েছে পারিবারিক প্রভাব।
‘আমার মা আর্জেন্টিনার ভক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাকে অনুসরণ করে আমিও আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে যাই।’
মজার বিষয় হলো, পরিবারের সবাই কিন্তু একই দলের সমর্থক নন। স্বামী এফএস নাঈম জার্মানির সমর্থক। আর ছোট বোন নন্দিতা সমর্থন করেন অন্য একটি দল।
তবে নাদিয়ার কাছে আর্জেন্টিনার জায়গা সবসময়ই আলাদা।
খেলা শেষে যখন আর্জেন্টিনা জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে, তখন স্টেডিয়ামের বাইরের পরিবেশও ছিল উচ্ছ্বাসে ভরা।
হাজার হাজার সমর্থক বিজয়ের আনন্দে গান গাইছেন, ছবি তুলছেন, একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
‘মনে হচ্ছিল পুরো শহরটাই উৎসবে মেতে উঠেছে,’ বলেন নাদিয়া।
তার মতে, জীবনে অনেক সুন্দর মুহূর্ত এসেছে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে বসে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার জয় এবং মেসির খেলা কাছ থেকে দেখা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
‘মেসি কোটি মানুষের স্বপ্নের তারকা। তাকে সামনে থেকে খেলতে দেখা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার প্রিয় দল বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে জয় দিয়ে। এই জয়যাত্রা যেন শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’
স্টেডিয়ামের সেই রাত হয়তো শেষ হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু নাদিয়া আহমেদের স্মৃতিতে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা উচ্ছ্বাস আর মেসির সেই উপস্থিতি থেকে যাবে আজীবন।