মার্কিন কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ বাদ, বেইজিং-নয়াদিল্লিকে কী বার্তা দিচ্ছে পেন্টাগন?
ভূ-রাজনীতিতে কোনো একটি নাম বা পরিভাষা শব্দকে ছাপিয়ে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, বৈদেশিক নীতি এবং বৈশ্বিক লক্ষ্যের সুস্পষ্ট মনোভাবের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে পুরোনো এবং বিশালতম কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটি ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানায় মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম ইউএসএনআই নিউজ।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার (যা আগে পেন্টাগন বা ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স নামে পরিচিত ছিল) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে, ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ এখন থেকে পুনরায় এর পুরোনো নাম ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ হিসেবেই পরিচিত হবে।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই এই কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ রাখা হয়েছিল। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে একই কমান্ডের নাম পুনরায় বদলে ফেলার ঘটনা তাই বিশ্বজুড়ে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ূন কবীর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার মাধ্যমে এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে নাম পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যাচ্ছে, বরং সেখানে তাদের কৌশলগত উপস্থিতি আরও জোরদার হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনে ডেইলি স্টারকে বলেন, পেন্টাগনের কোনো কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাহলে এর পেছনে কেবলই কি ইতিহাসপ্রীতি কাজ করছে নাকি লুকিয়ে আছে গভীর কোনো রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ?
২০১৮ সালের প্রেক্ষাপট
প্যাসিফিক কমান্ডের ইতিহাস বেশ সুদীর্ঘ। ইউএস কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান এই কমান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ নামেই পরিচালিত হয়ে আসছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহৎ সামরিক কমান্ড।
মিলিটারি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস হাওয়াইয়ের পার্ল হারবার-হিকাম ঘাঁটিতে এক অনুষ্ঠানে এই কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ রাখার ঘোষণা দেন।
সেই সময়ে এই নাম পরিবর্তনের পেছনে সুস্পষ্ট কৌশলগত কারণ ছিল। মূলত ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংযোগকে স্বীকৃতি দিতে এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
জেমস ম্যাটিস তখন বলেছিলেন, এই কমান্ডের ভৌগোলিক পরিধি ‘বলিউড থেকে হলিউড এবং মেরুভল্লুক থেকে পেঙ্গুইন’ পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইউএস কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই নামকরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতকে এশীয় নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তাছাড়া চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের’ (বিআরআই) বিপরীতে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত চীনের প্রভাব রুখতে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তুত, সেই প্রচ্ছন্ন বার্তাও বেইজিংকে দেওয়া হয়েছিল।
তৎকালীন কমান্ড প্রধান অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিসও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে স্বাধীন ও নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ূন কবীর বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো এখন চীন মোকাবিলায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রদের—বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার—ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে।
বর্তমান পরিবর্তন: সরকারি ভাষ্য কী?
আট বছর পর কেন আবার পুরোনো নামে ফিরে যাওয়া হলো? যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত প্যাসিফিক কমান্ডের ঐতিহাসিক শেকড় এবং ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠন থেকে শুরু করে কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অসংখ্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে এই কমান্ডের যে অসামান্য অবদান রয়েছে, তা স্মরণ করতেই এই পুরোনো নাম ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, নাম পরিবর্তন হলেও কমান্ডের মূল মিশন, দায়িত্ব এবং ভৌগোলিক সীমারেখায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসছে না। এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতিতে প্রতীকী পদক্ষেপের গুরুত্ব সবসময়ই ছিল। নিজের নামকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও পরিচয় নিয়ে বিতর্ক—এসবই দেখায় যে ট্রাম্প প্রশাসন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করে তুলতে চান। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ থেকে ‘ইউএস-প্যাসিফিক’ ধরনের ধারণার দিকে ঝোঁকও সেই ধারার অংশ হতে পারে।
এদিকে অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারোর নেতৃত্বাধীন এই কমান্ড তার মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি মুক্ত ও অবাধ ব্যবস্থা বজায় রাখার নীতিতেই অটল থাকবে বলে সরকারিভাবে দাবি করা হয়েছে।
পিট হেগসেথের ‘রিব্র্যান্ডিং’ অ্যাজেন্ডা
সরকারিভাবে ঐতিহ্যের কথা বলা হলেও, এই পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নতুন প্রশাসনের একটি বড় ‘রিব্র্যান্ডিং’ এজেন্ডা কাজ করছে।
ব্রেকিং ডিফেন্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে সেক্রেটারি অব ওয়ার (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পিট হেগসেথ মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনছেন।
তার এই রিব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ‘ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের’ নাম পরিবর্তন করে এর ঐতিহাসিক নাম ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ রাখা হয়েছে।
যদিও কংগ্রেসে এটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এই নতুন (এবং ঐতিহাসিক) নাম ব্যবহার করছেন বলে জানায় মিলিটারি ডটকম।
এছাড়াও হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটির নাম পরিবর্তন করে পুনরায় সহযোগী নেতাদের নামে ফিরিয়ে এনেছেন। এর আগে বাইডেন প্রশাসন এটি পরিবর্তন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ হেগসেথ ফোর্ট লিবার্টিকে পুনরায় ফোর্ট ব্র্যাগ করেছেন।
তাই ধারণা করা হচ্ছে, প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পরিবর্তনও হেগসেথের সেই একই ঐতিহাসিক নামকরণে ফিরে যাওয়ার রাজনৈতিক এজেন্ডারই একটি অংশ।
তবে অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক, ইন্দো-প্যাসিফিক এবং ইউএস-প্যাসিফিক—এই তিনটি পরিভাষা ভবিষ্যতে পাশাপাশি ব্যবহৃত হতে পারে। এগুলোর প্রতিটির পেছনে ভিন্ন ভিন্ন ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করবে। তাই এটি কেবল নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং আঞ্চলিক কৌশলগত কাঠামোর একটি পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি থিংকট্যাংক দ্য স্ট্র্যাটেজিস্টের প্রতিবেদন অনুযয়ী, হেগসেথ সম্প্রতি শাংরি-লা ডায়লগে দেওয়া এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে মূলত একটি ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তখন এই পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ূন কবীর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবেই থাকবে ভারত। কিন্তু নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা কিছুটা বদলে যেতে পারে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং ইরান যুদ্ধের অবসান
নাম পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের নতুন এই কৌশলে মার্কিন হোমল্যান্ড বা মাতৃভূমি রক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগর যুক্তরাষ্ট্রের দুই পাশে অবস্থিত হলেও, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো সীমান্ত নেই। তাই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের শক্তিমত্তা সংহত করার দিকেই তারা এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিও একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সাড়ে তিন মাসের তীব্র যুদ্ধের অবসান হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি শান্তি চুক্তিতে সইয়ের কথাও জানিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ইরান ছয়টি জিসিসি রাষ্ট্রজুড়ে (বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং ইউএই) ৪০০টির বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং প্রায় ১ হাজার ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তবে এই শান্তি চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে (জিসিসি রাষ্ট্র) ইরানের পুনর্গঠন তহবিল হিসেবে ৩০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষার আর্থিক দায়ভার পুরোপুরি চাপিয়ে দিচ্ছে। মিত্রদের প্রয়োজনে আগের মতো শর্তহীনভাবে পাশেও থাকছে না তারা।
অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচয় ও ভূমিকাকে আরও সরাসরি সামনে আনার প্রবণতা দেখা যায়।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে পুনরায় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পাঠাতে শুরু করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ইউএসএস বক্সার নামক একটি উভচর অ্যাসল্ট জাহাজ (পানি ও সমতলে আক্রমণে সক্ষম) মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছিল। সেটিকে পথ পরিবর্তন করে দক্ষিণ চীন সাগরে সপ্তম নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানায় সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
এটি স্পষ্টতই চীনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ভারত, কোয়াড এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রভাব
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দেওয়া ভারতের জন্য বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৮ সালে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত মহাসাগর ও ভারতকে যে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, এই প্রত্যাবর্তনের ফলে তা ক্ষুণ্ণ হলো কি না, সেই প্রশ্নটি এখন ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত ও অন্যান্য ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলো এই পদক্ষেপে নিজেদের কিছুটা অবহেলিত বোধ করতে পারে।
বিশেষ করে সম্প্রতি ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক নীতি এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে এমনিতেই কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
ভারতীয় নাবিক নিহতের ওই ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একজন মার্কিন কূটনীতিককে তলব করে তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছিল বলে জানায় হিন্দুস্তান টাইমস।
এছাড়া ‘কোয়াডের’ (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার জোট) ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে অধ্যাপক দেলোয়ার মনে করেন, এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে বা কোয়াডভিত্তিক সহযোগিতা থেকে সরে যাচ্ছে। চীনকে মোকাবিলা, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো কৌশলগত লক্ষ্যগুলো আগের মতোই বহাল থাকবে।
এদিকে ভারতের কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য শশী থারুর সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এটি কি কোয়াডের কফিনে আরও একটি পেরেক?’
যদিও গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ১১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোয়াডের ওপর খুব একটা জোর দেয়নি।
কোয়াড জোট প্রসঙ্গে হুমায়ূন কবীর বলেন, নাম পরিবর্তনের কারণে জোটটির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কোয়াডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আগের তুলনায় কিছুটা কমে এসেছে বলে ধারণা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, বাইডেন প্রশাসনের সময় কোয়াডকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে সেই মাত্রার মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি ভারতের কাঁধেই ছেড়ে দিতে চাইছে।
সাবেক ভারতীয় সেনাকর্মকর্তা লে. জেনারেল ডিপি পাণ্ডে (অব.) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এই ঘটনা মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতার একটি প্রতিফলন এবং এখন ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।
বিশেষ করে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং লাক্ষাদ্বীপে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে ভারতের উল্লেখ কমে যাওয়া এবং এই নাম পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন কৌশলগত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক বেশি লেনদেনমূলক হয়ে উঠেছে।
অধ্যাপক দেলোয়ার এ বিষয়ে বলেন, ভারতের মধ্যে এ ধরনের নাম পরিবর্তন নিয়ে কিছু অস্বস্তি থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দিল্লির পক্ষে তা প্রতিরোধ করা সহজ হবে না।
অন্যদিকে, চীনের কাছে এই পদক্ষেপের একটি দ্বৈত অর্থ থাকতে পারে। বেইজিং একদিকে খুশি হতে পারে যে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামকরণের মাধ্যমে তাদের ঘিরে ফেলার যে কৌশল যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল, তা থেকে তারা পিছু হটল।
দ্য স্ট্র্যাটেজিস্টের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ এবং ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ নামকরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ওপর সরাসরি এবং অত্যন্ত কঠোর মনোযোগ দিচ্ছে, তা বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও হতে পারে।
বাংলাদেশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইউএস-প্যাসিফিক’ ধারণাকে কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, তা নির্ভর করবে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য উপকূলীয় ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রের অবস্থানের ওপর। বাংলাদেশের জন্য আপাতত ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা এবং সম্ভাব্য নতুন মার্কিন ন্যারেটিভ—দুইটিকেই পর্যবেক্ষণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ূন কবীর বলেন, প্যাসিফিক কমান্ড হোক বা অন্য কোনো নাম, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সহযোগিতা রয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। নাম পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে করি না।
কিন্তু ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের’ নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ রাখাটা কেবল একটি শব্দের পরিবর্তন বা নিছক আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনার আড়ালে পিট হেগসেথের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রিব্র্যান্ডিং, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে মিত্রদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে এখন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্লু-প্রিন্ট সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে হবে।