ট্রাম্পের করোনা টাস্কফোর্স প্রধান হিসেবে ড. বার্ক্সের বিচিত্র অভিজ্ঞতা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য মানুষের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবাণুনাশক প্রবেশ করানোর পরিকল্পনার কথা জানান, তখন হতবাক হয়ে পড়েন করোনাভাইরাস প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রধান ড. ডেবোরা বার্ক্স।

সম্প্রতি এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন বার্ক্স। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে করোনাকালে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার বিভিন্ন জানা-অজানা ঘটনা।

ড. বার্ক্স জানান, নিউইয়র্ক শহরে শিশুদের খেলার জায়গাগুলো খোলা রাখার জন্য জোগাড় করা তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্প এই উদ্যোগ নিতে উদ্যত হন।

এবিসি নিউজকে বার্ক্স জানান, তিনি ট্রাম্পের দলের অন্যান্য ডাক্তারদের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেছিলেন, যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউচি। সমঝোতা অনুযায়ী, দলের কেউ বরখাস্ত হলে বাকি সবাই একযোগে পদত্যাগ করবেন।

আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে বার্ক্সের নতুন বই 'সাইলেন্ট ইনভেশন: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব দ্য ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, কোভিড-১৯ অ্যান্ড প্রিভেনটিং দ্য নেক্সট প্যানডেমিক বিফোর ইট'স টু লেট'।

বইতে তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের আমলে হোয়াইট হাউজের বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে তিনি মানিয়ে চলার উপযোগী ছিলেন না।

তিনি আরও লিখেছেন, ট্রাম্পের দলে মাঠপর্যায়ে মহামারির মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একমাত্র ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও তাকে বারবার উপেক্ষা করা হতো।

আমেরিকানরা বার্ক্সকে মূলত মনে রাখবে ২০২০ সালের ২৩ এপ্রিল হোয়াইট হাউজের সংবাদ সম্মেলনের সময় আরও জোরালো ভাবে ট্রাম্পের বক্তব্য সংশোধনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে।

deborah_birx.jpg
গণমাধ্যমের উদ্দেশে ব্রিফিং দিচ্ছেন বার্ক্স। ছবি: রয়টার্স

সে সময় নিউইয়র্কের খেলার মাঠগুলো মাত্রই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বার্ক্সের মতে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একজন বিজ্ঞানী ট্রাম্পকে জানাচ্ছিলেন, কীভাবে সূর্যের আলো তাদেরকে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

পরবর্তী বেশ কিছুটা সময় ট্রাম্প ওই বিজ্ঞানীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালাতে থাকেন। এ সময় তিনি ত্বকের মাধ্যমে মানুষের দেহে কৃত্রিমভাবে তীব্র আলো বা অতিবেগুনী রশ্মি প্রবেশ করিয়ে করোনাভাইরাস ধ্বংস করার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি ওই বিজ্ঞানীকে এ ধরনের একটি প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে দেখতে বলেন।

এ ছাড়াও, তিনি ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবাণুনাশক পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করিয়ে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার সম্ভাব্যতা যাচাই করার কথাও আলোচনা করেন। তবে এতে ফুসফুসের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বলেও মত দেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প বলেন, 'আমি এক জীবাণুনাশক দেখতে পাচ্ছি, যা একে (করোনাভাইরাস) এক মিনিটের মধ্যে নকআউট করে দিতে পারে, মাত্র এক মিনিটে। এমন কোনো উপায় কি আছে, যার মাধ্যমে আমরা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাতে পারি বা প্রায় পুরো দেহকে পরিষ্কার করে ফেলতে পারি? আপনারা যেরকম দেখছেন, এটি ফুসফুসে চলে যায় এবং ফুসফুসের ওপর এটি বড় আকারের প্রভাব ফেলে। সুতরাং এই বিষয়টিও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।'

এ মুহূর্তকেই 'ট্রাম্পের জীবাণুনাশক ইনজেকশন মুহূর্ত' বলে অভিহিত করা হয়েছে।

বার্ক্স বলেন, 'আমি অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলাম যে সূর্যের আলোর মধ্যে প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক উপকরণ আছে। এর রয়েছে এমন কিছু উপকরণ তৈরির সক্ষমতা, যেগুলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধ্বংস করে। এতেও কাজ হতে পারে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে খোলা আকাশের নিচে, সূর্যের আলোয় খেলার মাঠে পাঠিয়ে উপকৃত হতে পারবেন।'

তবে বার্ক্স বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করেন, ক্যামেরা চলমান থাকা অবস্থায় ট্রাম্প এবং উল্লেখিত সরকারি বিজ্ঞানী অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন।

এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করেন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মানবদেহে জীবাণুনাশক প্রয়োগ করে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা করা উচিৎ কি না।

এ কথা শুনে বার্ক্স তার আসনে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে ওঠেন।

বার্ক্স
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বার্ক্স। ছবি: রয়টার্স

'আমি তখন কল্পনা ও বাস্তবের মাঝামাঝি এক জগতে বিচরণ করছিলাম। আমি মনেপ্রাণে চাইছিলাম, সবকিছু অদৃশ্য হয়ে যাক। আমার মনে হচ্ছিল অনেক কিছু একইসঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে,' বলেন তিনি।

গত সোমবার গুড মর্নিং আমেরিকা অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্ক্স সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণা করেন।

বলেন, 'এটা (ট্রাম্পের বক্তব্য) এমন একধরনের বিপর্যয় ছিল, যার অনেকগুলো পর্যায় রয়েছে।'

'আমি শিগগির তার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং অলিভিয়া ট্রয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি তাদেরকে জানাই, এই বক্তব্যকে এখনই ঘুরিয়ে দিতে হবে,' যোগ করেন বার্ক্স। অলিভিয়া ট্রয় ছিলেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের উপদেষ্টা।

পরের দিন সকাল থেকে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বলতে শুরু করেন, তিনি ঠাট্টা করেছিলেন।

বার্ক্স বলেন, 'তবে আমার ধারণা সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে সবাই নিশ্চিতভাবে জেনে গিয়েছিলেন, বিষয়টি খুবই বিপজ্জনক ছিল।'

বার্ক্স চিন্তিত ছিলেন, আমেরিকানরা হয়তো ভাববে ট্রাম্প সরাসরি তার সঙ্গেই কথা বলছিলেন। তবে প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেই বিজ্ঞানীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন।

বার্ক্স সে সময়ও এতটাই হতবাক হয়েছিলেন যে, তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে পারেননি বা সংশোধনও করেননি। অসংলগ্ন কিছু কথা বলে তিনি চুপ হয়ে যান।

তবে তিনি এখন এ ভুলের জন্য অনুতপ্ত।

'সবাই যাতে এই ভাইরাসকে গুরুত্ব সহকারে নেয়, সেটা নিশ্চিত করতে আমরা অনেক সময় নিয়েছিলাম এবং আমরা সেই মুহূর্তে মার্কিনীদের জীবন বাঁচানোর জন্য অসংখ্য জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম,' যোগ করেন বার্ক্স।

তিনি আরও বলেন, 'আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সেই মুহূর্তের (ট্রাম্পের বক্তব্যের) পর সব কিছু নতুন করে উন্মোচিত হবে।'

বার্ক্স তার বইতে লিখেছেন, একযোগে পদত্যাগের সমঝোতায় তার সঙ্গী ছিলেন অ্যান্টনি ফাউচি, সিডিসির পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ড এবং এফডিএর কমিশনার স্টিফেন হান।

বার্ক্স জানান, আমি বরখাস্ত হওয়া নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না, কারণ আমি দ্বৈত দায়িত্ব পালন করছিলাম। ট্রাম্পের দল থেকে চাকরিচ্যুত হলে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অপর চাকরিতে পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে ফিরতেন।

তবে রেডফিল্ড ও হানকে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন বলে জানান বার্ক্স।

হোয়াইট হাউজের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে এই ২ জনকে নিয়ে নিরন্তর কানাঘুষো চলছিল।

তিনি বলেন, 'আমি বেশ কয়েকবার ভাইস প্রেসিডেন্টকে (পেন্স) অনুরোধ করি বব (রেডফিল্ড) ও স্টিভের (হান) সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য। আমি চিফ অব স্টাফকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেই, ওদের কারো চাকরি গেলে আমরা সবাই চলে যাব।'

এমন পরিস্থিতি কখনো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বার্ক্স বলেন, 'কখনো কখনো আমার এমন মনে হয়েছে, টিকা তৈরির বিষয়ে স্টিভ মাত্রাতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছেন।'

'আমি তাকে জানাতে চেয়েছিলাম, আমি সব সময় তার পক্ষে থাকবো; ঘটনা যাই হোক না কেন,' যোগ করেন তিনি।

বাকি সবাই টাস্কফোর্সের সমাপ্তির পর নিজ নিজ মূল কর্মক্ষেত্রে ফিরে যান। তবে বার্ক্স তখনো হোয়াইট হাউজের কর্মী হিসেবে থেকে যান।