মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় সংস্কারের প্রস্তাব: ৫ বিষয়ের বেশি পাবলিক পরীক্ষা নয়

আরাফাত রহমান
আরাফাত রহমান

মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘদিনের শেখার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে একটি সরকারি পরামর্শক কমিটি পাবলিক পরীক্ষা মাত্র পাঁচটি মূল বিষয়ে সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে পাওয়া খসড়া প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়নবিষয়ক এই পরামর্শক কমিটি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষায় শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

গত বছরের অক্টোবর মাসে গঠিত ১০ সদস্যের এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। কমিটির মতে, পাবলিক পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা যাচাই করা, স্কুলে পড়ানো প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে পরীক্ষার আওতায় আনা নয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ধর্ম, শরীরচর্চা ও চারুকলার মতো বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষার বাইরে রাখা হবে। এসব বিষয়ের মূল্যায়ন করা হবে স্কুলভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বহু বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়, যার ফলে কিশোর বয়সেই তাদের ওপর ‘অপ্রয়োজনীয় একাডেমিক চাপ’ সৃষ্টি হয়। এতে ভাষা ও গণিতের মতো ভিত্তিমূলক দক্ষতা জোরদার করার সুযোগ কমে যায়।

কমিটি আরও জানিয়েছে, পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি সংক্ষিপ্ত হলে পরীক্ষার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ রাখতে হবে না। এতে বর্তমানে পরীক্ষার জন্য যে কয়েক সপ্তাহ পাঠদান বন্ধ থাকে, সেই সময়টুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে হাতে-কলমে ব্যবহারিক পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নয়

কমিটি সুপারিশ করেছে, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা স্থায়ীভাবে বাতিলই থাকবে। গত বছর পুনরায় চালু করা জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষাকে তারা ‘অপ্রয়োজনীয়’ উল্লেখ করে বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব পরীক্ষার কারণে নিয়মিত শ্রেণি পাঠ ব্যাহত হয়। শিক্ষকরা অল্পসংখ্যক নির্বাচিত পরীক্ষার্থীর দিকে বেশি মনোযোগ দেন, ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।

কমিটি দশম শ্রেণি পর্যন্ত একক ও অভিন্ন পাঠ্যক্রম চালু রাখার সুপারিশ করেছে। নবম শ্রেণি থেকেই বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে শিক্ষার্থী বিভাজনের বর্তমান ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিভাগ বিভাজন ‘ভেবেচিন্তে করা হয়নি’ এবং বিশেষায়ন শুরু হওয়া উচিত একাদশ শ্রেণি থেকে।

কমিটির মতে, দশম শ্রেণিতে প্রশাসনিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভাগ করে দেওয়া শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি ‘বাধা’। ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে তারা প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে একক মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের অধীনে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।

ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রতিবেদনে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাধ্যমিক স্তর হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই সুপারিশগুলোর পেছনে মাঠপর্যায়ের একটি মূল্যায়ন কাজ করেছে, যেখানে বড় ধরনের শেখার ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। কমিটি চর, হাওর ও উপকূলীয় এলাকার স্কুলসহ ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করেছে।

গণিতে দেখা গেছে, অষ্টম শ্রেণির ৭৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নবম শ্রেণির ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩৩ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে। মোট হিসেবে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে পাস নম্বর তুলতেই ব্যর্থ হয়েছে।

ইংরেজিতেও ফলাফল দুর্বল, ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাসের মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

শিক্ষাবর্ষ ও ক্লাসের সময়কাল

কমিটি বর্তমান জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষকে একটি ‘ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা শিক্ষাবর্ষ সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই ও আগস্ট মাসে দীর্ঘ ছুটি রাখা উচিত, কারণ এ সময় বর্ষার চরম অবস্থায় প্রায়ই শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়।

কমিটির মতে, সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে শীতকালজুড়ে নির্বিঘ্নে পাঠদান সম্ভব হবে এবং পরীক্ষার কারণে সময় নষ্ট কম হবে।

প্রতিবেদনে নির্ধারিত ৪৫ মিনিটের ক্লাস ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এটিকে একটি ‘যান্ত্রিক রুটিন’ বলা হয়েছে, যা পূর্ণাঙ্গ শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এক ক্লাস শেষ হয়ে আরেক শিক্ষক ক্লাসে আসার সময়েই অনেক কার্যকর শিক্ষাদান সময় নষ্ট হয়।

এই সমস্যা সমাধানে কমিটি প্রস্তাব করেছে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের ক্লাসের বদলে প্রতিটি বিষয়ের জন্য সাপ্তাহিক মোট পাঠদানের সময় নির্ধারণ করা হোক।

কমিটির মতে, এতে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস নেওয়া সম্ভব হবে, যা গভীর ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য বেশি সহায়ক হবে।