‘হাজারো শিক্ষার্থী কেন ক্লাসরুমে ফিরতে পারছে না,’ প্রশ্ন তুলে ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা ঢাবি শিক্ষার্থীর
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—এমন অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়েছেন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থী এ আর তাহসিন জাহান।
নিজ বিভাগে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনকারী এই শিক্ষার্থী সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
নিজ নিজ বিভাগে সর্বোচ্চ একাডেমিক ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি হিসেবে ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে থাকে ঢাবি প্রশাসন।
পোস্টে তাহসিন জানান, চার বছরের স্নাতক জীবনের শুরু থেকেই তিনি এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং এটি অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় কোনো সহিংসতায় জড়িত না থাকা সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি মব হামলার শিকার হয়েছেন। এমনকি নিজ বিভাগে তিনি হুমকির মুখে পড়েন এবং তাকে চূড়ান্ত ভাইভায় অংশ নিতে ও স্নাতক থিসিস জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়।
পোস্টে তাহসিন লিখেছেন, ‘যে পুরস্কারটি অর্জনের জন্য এতটা পরিশ্রম করেছি, সেটি প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু কোনো পুরস্কারের মর্যাদা আমার কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।’
‘এই পুরস্কার গ্রহণ করার অর্থ হতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি উদযাপন করা, যে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন নিজেদের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি,’ বলেন তিনি।
তিনি জানান, কয়েকজন শিক্ষক তার পড়াশোনা শেষ করতে সহায়তা করেন এবং ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা অবস্থায় তাকে অনলাইনে চূড়ান্ত ভাইভায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। তবে তারা 'বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের' কেউ নন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাহসিন আরও বলেন, ‘আমার শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে শেষ পর্যন্ত ঢাবিতে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পেরেছি এবং হার্ভার্ডে এসে নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি।’
‘কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মতো ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সেই সুযোগ পায়নি। প্রশাসন নীরব থেকেছে এবং মৌলবাদী মবকে নীরবে সমর্থন করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।
পোস্টে তিনি আরও লিখেছেন, ‘যেসব শিক্ষক আমাকে এত দূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আমার অর্জনের পেছনে তাদের অবদান রয়েছে এবং সেই কৃতিত্ব তাদের প্রাপ্য। কিন্তু তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ করে আমি নিজের অর্জন উদযাপন করতে পারি না।’
‘এই সিদ্ধান্ত কোনো পুরস্কারকে ছোট করার জন্য নয়। বরং সেই সহপাঠীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, যাদের অপরাধ শুধু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, অথচ তার মূল্য তারা দিয়েছেন নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ দিয়ে। ন্যায়বিচার যদি সবার জন্য না হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়,’ যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তাহসিনের 'ডিনস অ্যাওয়ার্ড' প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাঈম সুলতানা বলেন, ‘২০২৪ সালে তাহসিন বিভাগে যোগাযোগ করে চূড়ান্ত ভাইভা দিতে ক্যাম্পাসে আসতে ভয়ের কথা জানিয়েছিলেন।’
‘বিষয়টি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডিকে জানানো হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাহসিনকে ক্যাম্পাসে আসতে বলা হয়। কিন্তু তিনি বিদেশে অবস্থান করায় পরে তার ভাইভা অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,’ বলেন তিনি।
তাহসিনের ওপর মব হামলার বিষয়ে অবগত নন জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৪ সালের পর তাহসিন বিদেশে আছেন বলেই তারা জানেন।
‘তাহসিনের সঙ্গে তার সহপাঠীদের ঠিক কী হয়েছিল, তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়,’ অধ্যাপক নাঈম সুলতানা।