আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে তদন্তে পক্ষপাত নেই: দুদক

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ‘টার্গেটেড’ নয় বলে দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান আজ সোমবার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।

তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং তদন্তের ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিস্তারিত জানাতে চাননি তিনি।

তিনি বলেন, ‘চলুন আজকের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকি। এ বিষয়ে কথা না বলি।’

তিনি আরও বলেন, কমিশন না থাকায় বেশ কিছু বিষয় পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে মুলতবি ছিল। আইনের বিধান অনুযায়ী সেই অভিযোগগুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে কাজ করছে দুদক।

সাইদুর বলেন, ‘আগামী দিনগুলোতে আপনারা দেখতে পাবেন, আমরা পক্ষপাতদুষ্টভাবে কোনো কাজ করছি না।’

তিনি বলেন, অন্য কোনো সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হলে তা আইন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হবে। তবে কোনো সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারেননি।

দুদকের ওপর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব কাজ করছে, এমন দাবিও নাকচ করেন সাইদুর।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কারও প্রভাব বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে আমরা কোনো মামলা পরিচালনা করছি না। আমরা ন্যায্যভাবে এবং আইন অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’

যেসব অভিযোগ

রোববার আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, নিয়োগ-পদায়নে অর্থ লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়াসহ নতুন কিছু অভিযোগ পাওয়ার কথা জানায় দুদক। চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে এসব অভিযোগ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন প্রশাসক নিয়োগের ঘটনায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার লেনদেনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।

দেশের ৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নের জন্য ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-সংক্রান্ত কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারও এসব অভিযোগের আওতাভুক্ত।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ‘হাজার হাজার কোটি টাকা’ নেওয়া হয়েছে। এতে আসিফ মাহমুদের নিজ শহর কুমিল্লার মুরাদনগরের একটি গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়েও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিতে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগ দিতে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দিতে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।

ডিএনসিসিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিযোগ করা ৬০ কোটি টাকা যোগ করলে, চারটি অভিযোগে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮৭ কোটি টাকা।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হেলিকপ্টারে যাতায়াতের মাধ্যমে আসিফ মাহমুদ সরকারি অর্থের অপচয় করেছেন। এতে আরও বলা হয়, তিনি নিয়মিত ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে যেতেন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন।

দুদকের নথি অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দুবাইয়ে, ৩ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে, ২ হাজার কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ায় এবং ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুইজারল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাচার করা টাকার পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা।

আসিফের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।

তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

আসিফ মাহমুদের পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষের লেনদেনে তদবির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার আসিফ মাহমুদের

গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কথিত অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদ ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

অন্য তিনজন হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল তদন্তটি পরিচালনা করছে।

আসিফের দায়িত্বকালে মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত নথিও চেয়েছে কমিশন।

৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ আগের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে দুদকের তদন্তকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিক হয়রানি বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, ১৩৫ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ জারি করা হয় ২০২৬ সালের ১১ মে, অর্থাৎ তিনি সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর।

৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের একটি রায় বাস্তবায়নের জন্য ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।

পরে দুদকের উপপরিচালক আখতারুল ইসলামকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর মধ্যে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়া গেছে, এমন বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান আসিফ মাহমুদ।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এবং পরে এনসিপির মুখপাত্র হিসেবে দলটিতে যোগ দেন।