সফল হতে বিল গেটসের ৫ পরামর্শ
বিল গেটস কেবল মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। তার সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা ও নতুন কিছু শেখার অদম্য আগ্রহ।
অনেকে বিল গেটসের কাছ থেকে সফলতার পরামর্শ জানতে চান। তিনিও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, বক্তব্য ও লেখায় নানা সময়ে পরামর্শ দিয়েছেন। সেখান থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো।

এমন দক্ষতা অর্জন করা, যার মূল্য কখনো কমে না
বিল গেটস সারা জীবন শেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বছরে প্রায় ৫০টি বই পড়েন এবং বই পড়াকে নিজের শেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম মনে করেন।
২০১৬ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেছিলেন, নতুন কিছু শেখা ও নিজের বোঝাপড়া যাচাই করার প্রধান উপায় এখনো তার কাছে বই পড়া।
তার মতে, প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, বিজ্ঞান কিংবা কোডিংয়ের মতো দক্ষতা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে সব দক্ষতাই যে প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে, এমন নয়। ভালো লেখালেখি, জটিল সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ কিংবা নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতাও দীর্ঘমেয়াদে মূল্য তৈরি করতে পারে।
এর অর্থ খুব সহজ, কেবল চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, বরং আগামী ১০ বছরেও কাজে লাগবে এমন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
অগ্রগতি ধীর হলেও আশাবাদী থাকা
বিল গেটস দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় বিশ্বাসী। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, রোগ নির্মূল, জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও তিনি আশাবাদকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
২০১৪ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় বলেছিলেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও আশাবাদ নতুন উদ্ভাবন ও নতুন সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, সম্পদ তৈরি বা ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। শুরুতে আয় কম হতে পারে, প্রত্যাশিত সাফল্য নাও আসতে পারে, বিনিয়োগে দ্রুত লাভ নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকলে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
সাধারণত এক রাতের মধ্যে সফলতা আসে না। যারা নিজেদের পরিশ্রমের ওপর বিশ্বাস রাখেন এবং ধীরগতির অগ্রগতিতেও কাজ চালিয়ে যান, দীর্ঘমেয়াদে তারাই এগিয়ে যেতে পারেন।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুতি
বিল গেটসের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত থাকা, আবার সম্ভাবনার দরজাও বন্ধ না করা।
তিনি বিজনেস ইনসাইডারকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিপদের কথা মাথায় রেখে সঞ্চয় করতে হবে, কিন্তু কেবল ভয় পাওয়ার কারণে ভবিষ্যতের সুযোগ থেকে দূরে থাকা যাবে না।
মাইক্রোসফটের শুরুর দিনগুলোতে গেটস প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ হাতে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, যেন কোনো আয় না এলেও প্রায় এক বছর কোম্পানির কার্যক্রম চালানো যায়।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও শিক্ষা হলো, প্রথমে একটি জরুরি সঞ্চয় গড়ে তুলুন। এরপর নিজের আর্থিক সামর্থ্য, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা ও লক্ষ্য বুঝে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করুন।
তবে বিনিয়োগের আগে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় অপরিচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় টাকা বিনিয়োগ করা গেটসের পরামর্শের উদ্দেশ্য নয়।
ব্যস্ত থাকা, তবে নিজের জন্য সময় রাখা
বিল গেটস একসময় মনে করতেন, একজন সফল নেতার ক্যালেন্ডারের প্রতিটি মুহূর্ত কাজ দিয়ে ভরা থাকা উচিত। পরে ওয়ারেন বাফেটের কাছ থেকে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা পান।
এক আলোচনায় গেটস বলেন, তিনি যখন বাফেটের ক্যালেন্ডার দেখেছিলেন, সেখানে এমন সপ্তাহও ছিল যেখানে কোনো কাজের কথা ছিল না। এতে তার ধারণা বদলে যায়।
গেটস পরে বলেন, নিজের প্রতিটি মিনিট ব্যস্ততায় ভরে রাখা মানেই কেউ গুরুত্বপূর্ণ বা পরিশ্রমী হয়ে ওঠে না। বরং নিজের জন্য কিছু সময় রাখতে হবে। পড়া, চিন্তা করা ও বড় সমস্যাগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার জন্য এই সময় রাখা দরকার।
এই শিক্ষা ব্যক্তিগত অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন ব্যস্ত থাকলেই সফলতা আসে না। কোন কাজটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কাজটি ভবিষ্যতে মূল্য তৈরি করবে সেটি বোঝা বেশি জরুরি।

বিশ্ব কোন দিকে যাচ্ছে, সেদিকে নজর রাখা
বিল গেটসের সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো ভবিষ্যতের পরিবর্তন সম্পর্কে আগেভাগে ধারণার চেষ্টা করা। মাইক্রোসফট গড়ে ওঠার সময় তিনি সফটওয়্যার বিপ্লবের সম্ভাবনা বুঝেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন।
২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া এক টুইটার (বর্তমান এক্স) পোস্টে গেটস লিখেছিলেন, তিনি যদি নতুন করে ক্যারিয়ার শুরু করতেন, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি ও জীববিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিতেন।
এই পরামর্শটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যারিয়ার, ব্যবসা বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বর্তমানে কী জনপ্রিয় তা দেখে প্রলুব্ধ হওয়া যাবে না। বরং আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কোন প্রযুক্তি বা খাত পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে সেটিও ভাবা দরকার।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও জীববিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের দিকে নজর রাখা মানে কেবল নতুন কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করা নয়; বরং কোন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা।

ধনী না হয়েও গেটসের মতো চিন্তা করা যায়
বিল গেটসের মতো চিন্তা করতে ধনী হতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। কারণ তার সফলতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস শুরু করতে কোনো অর্থই লাগে না।
তিনি মূলত নিয়মিত শেখা, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা, সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সঞ্চয় করা, বুঝে বিনিয়োগ করা, সময়কে গুরুত্ব দেওয়া ও ভবিষ্যতের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন। আর এসব পরামর্শ যে কেউ নিজের জীবনে কাজে লাগাতে পারেন।

