ঢাকা-৬: উত্তরাধিকারের রাজনীতি বনাম প্রতিশ্রুতির লড়াই

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

নির্বাচনের মাত্র দুদিন বাকি। এর আগে প্রচারণার পুরো সময়ে ঢাকা-৬ আসনে ভোটের উত্তেজনা ছিল স্পষ্ট। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়ার অলিগলি ছিল মিছিল আর স্লোগানে সরগরম।

এলাকার দীর্ঘদিনের নাগরিক সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের কাছে যান প্রার্থীরা। জাতীয় নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে সংসদে পাঠিয়ে পরিবর্তনের আশায় আছেন এলাকার বাসিন্দারা।

ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড মিলে ঢাকা-৬ আসন। এ আসনেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সদরঘাট, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, আহসান মঞ্জিল, জয়কালী মন্দির, বলধা গার্ডেন, আসগর আলী মেডিকেল কলেজ, নারিন্দা ও ধূপখোলার অবস্থান।

পুরো এলাকা অপেক্ষায় আছে—কে হবেন তাদের জনপ্রতিনিধি। স্থানীয়রা জানান, এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে।

বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। আর জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক শিবির নেতা ও বর্তমানে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল মান্নান।

দুজনই এলাকায় জোরেশোরে প্রচারণা চালান, ভোটারদের কাছে যান। ভোটাররাও উপভোগ করেন নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রার্থীর কার্যক্রম।

স্থানীয়রা জানান, সাবেক মেয়র প্রার্থী এবং তরুণ নেতা হিসেবে ইশরাকের জনপ্রিয়তা বেশ ভালোই। তিনি এলাকায় বেশ কিছু মিছিল ও সভা করেছেন। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মান্নান সুসংগঠিতভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন, বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ করেছেন।

ভোটাররা জানান, ঢাকা-৬ আসনের প্রধান সমস্যা হলো গ্যাস ও পানি সংকট, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ যানজট এবং বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ ও দখল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রভাত কুমার সুর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা পুরান ঢাকার বাসিন্দারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। আমাদের এখানে গ্যাস ও পানির সমস্যা বহুদিনের। এটা সমাধান হচ্ছে না। রাস্তাঘাট সরু, দিনভর যানজট লেগেই থাকে। আর ধুলোবালি-ময়লা-আবর্জনার কারণে এলাকার পরিবেশ খুবই দূষিত।’

নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। প্রভাত বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা চাইলে এলাকার সমস্যা দূর করা সম্ভব। ভোটের আগে প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু পরে আর তাদের দেখা যায় না। দেখা যাক এবার পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় কি না।’

স্থানীয়দের মতে, বিএনপি প্রার্থী ইশরাকে তার বাবা সাদেক হোসেন খোকার কারণে বাড়তি সাড়া পান। তিনি গণসংযোগে বের হলে বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটাররা তাকে বাবার রাজনীতির উত্তরাধিকারী হিসেবে সমর্থন জানান। আর জামায়াত প্রার্থী মান্নান এলাকার তরুণ ভোটারদের মধ্যে সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।

প্রচারণার শেষ দিকে মান্নান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা কল্পনার চেয়েও বেশি সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রচারণা এতদিন চালানো হতো, মানুষ এখন আর তা গ্রহণ করছে না এবং ব্যালটের মাধ্যমে তারা এর প্রতিফলন ঘটাবে।’

জয়ী হলে তিনি পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আহসান মঞ্জিল, বলধা গার্ডেন সংরক্ষণ এবং পর্যটনকেন্দ্র গড়ার ওপর জোর দেবেন বলে জানান। এ ছাড়া তিনি বুড়িগঙ্গাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়নে তিনি চাঁদাবাজি বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান।

বিএনপি প্রার্থী ইশরাকের ‘উত্তরাধিকারের রাজনীতি’র সমালোচনা করে মান্নান বলেন, “পরিবারের পরিচয়ে রাজনীতিতে আসাকে পছন্দ করছে না তরুণ প্রজন্ম। দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ‘উত্তম বিকল্প’ খুঁজছে।”

‘অনেক দলকে আপনারা দেখেছেন। এবার আমাদের একটু সুযোগ দিন। আমরা আপনাদের কল্যাণে কতটুকু করতে পারি দেখুন,’ ভোটারদের উদ্দেশে বলেন তিনি।

এদিকে ইশরাক হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “আমার ও আমার পরিবারের ওপর বিভিন্ন সময়ে ‘জুলুম-নির্যাতনের’ কারণে জনগণের মধ্যে আমার প্রতি সহানুভূতি কাজ করছে।”

বাবা সাদেক হোসেন খোকার জনপ্রিয়তার কারণে কিছুটা বাড়তি সমর্থনের কথা স্বীকার করেই তিনই বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি উত্তরাধিকার সূত্রের রাজনীতির বিরোধী এবং আমি নিজেই লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে অবস্থান তৈরি করতে চাই।’

নির্বাচিত হলে তিনি যানজট নিরসনে রাস্তার অবৈধ দখল মুক্ত করা এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের চিন্তা করছেন। এ ছাড়া তিনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

‘তরুণদের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং আইটি স্টার্টআপের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা আছে। নারীদের জন্য দলের ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা এবং গণপরিবহনে আলাদা সেবার ব্যবস্থা করা হবে,’ বলেন তিনি।

ভোটারদের উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ‘আমাকে সুযোগ দিয়ে দেখতে পারেন। রাজনৈতিক ওয়াদাগুলো সঠিকভাবে পূরণ করার ক্ষেত্রে আমি আপনাদের নিরাশ করব না।’

এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন—গণফ্রন্টের আহম্মেদ আলী শেখ, গণঅধিকার পরিষদের মো. ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ইউনুস আলী আকন্দ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. আকতার হোসেন, জাতীয় পার্টির আমির উদ্দিন আহমেদ (ডালু)।

ঢাকা-৬ আসনের মোট ভোটার দুই লাখ ৯২ হাজার ২৮৩, যার মধ্যে এক লাখ ৫২ হাজার ৫১৯ জন পুরুষ, এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৬১ জন নারী ও তিনজন হিজড়া।