‘ঘৃণা ও গুজব ছড়ানোর’ পরিবর্তে সমালোচকদের ‘ধ্যান বা প্রার্থনা’ করার পরামর্শ ইনফান্তিনোর

স্পোর্টস ডেস্ক

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সমালোচকদের প্রতি তার নেতৃত্ব, ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও বিশ্বকাপ নিয়ে ‘ঘৃণা ও মিথ্যা গুজব ছড়ানোর’ পরিবর্তে ‘ধ্যান, প্রার্থনা বা ফুটবল ম্যাচ দেখার’ পরামর্শ দিয়েছেন।

সোমবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৫ স্লাইডের একটি পোস্ট দিয়েছেন ইনফান্তিনো। সেখানে ‘যারা কাগজ-কলমের আড়ালে ও স্ক্রিনের আড়ালে আছেন’, তাদের উদ্দেশ্যে নিজের কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন তিনি। ফিফা প্রধান বলেছেন, সমালোচকরা যখন ‘ঘৃণার বীজ বপনে ব্যস্ত’, ফিফা তখন ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আয়োজন’ উপহার দিচ্ছে।

ইনফান্তিনো আরও বলেছেন, বিশ্বকাপ ‘মানবতার সেরা রূপটি উদযাপন করেছে’। তিনি যোগ করেছেন, গত সপ্তাহে শেষ হওয়া ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ‘শতভাগ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ছিল, ছিল শুধুই আনন্দ ও উল্লাস’।

তিনি লিখেছেন, ‘যারা আমাদের এই সুন্দর খেলা, আবেগ, উদযাপন, হাসি, কান্না, বেদনা ও আনন্দ মিস করেছেন, তাদের সবার প্রতি সমবেদনা। আপনারা যারা সুন্দর এই খেলাটির জন্য শিশু থেকে শুরু করে বাবা-মা ও দাদা-দাদীর একসাথে জড়ো হওয়া দেখা মিস করেছেন... আমি দুঃখিত, আপনারা ঘৃণা আর সমালোচনায় এতটাই মগ্ন ছিলেন যে সবকিছুই মিস করেছেন।’

‘তারা যখন উদযাপন করছিল, তখন আপনারা ঘৃণার বীজ বুনতে ব্যস্ত ছিলেন। আমাদের এই বিশ্বের ভালোবাসা দরকার, ঘৃণা নয়; সহনশীলতা দরকার, বিভাজন নয়; উদযাপন দরকার, শোক নয়।’

‘যারা আমাদের ঘৃণা করে সময় ও শক্তি ব্যয় করছেন, দয়া করে কিছুটা সময় নিয়ে ভাবুন, ধ্যান করুন, প্রার্থনা করুন বা একটি ফুটবল ম্যাচ দেখুন এবং সত্যিকার অর্থে মানুষের মুখ, চোখ ও আবেগ পর্যবেক্ষণ করুন।’

‘কারণ একমাত্র আমাদের এই সুন্দর খেলাটিই এমন অসাধারণ একটি প্রদর্শনী উপহার দিতে পারে, যেখানে সবাই এক হয়ে যায় এবং মানুষ হিসেবে নতুন করে সংযুক্ত হয়।’

তবে টুর্নামেন্টের আলোচিত বেশ কিছু বিতর্ককে খুব একটা গুরুত্ব দেননি ইনফান্তিনো। সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সংঘাতের পরও বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণকে তিনি একটি সাফল্য হিসেবে দারুণ প্রশংসা করেছেন।

তিনি বলেছেন, ফিফা ‘যুদ্ধরত দুটি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে’ এবং ইরান ‘কোনো ধরনের ঘটনা বা সংঘাত ছাড়াই’ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পেরেছে।

যদিও তার এই মন্তব্যের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোয়েইর বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন যে, এবারের বিশ্বকাপে তার দল ছিল ‘সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত’।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু ইরানই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকরাও ভুক্তভোগী হন। এছাড়া, ‘সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্টতার’ অভিযোগে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি, যদিও তার কাছে একটি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল।

ইনফান্তিনো লিখেছেন, ‘আপনারা কয়েকজন মানুষের ভিসা না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিসা পাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। কারণ ফুটবল বিশ্বকে এক করে এবং এই গ্রীষ্মে সেটি দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’

বিশ্বকাপ চলাকালীন নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, সেখানে ‘কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, কোনো সহিংসতা ছিল না। সেখানে ছিল কেবল আনন্দ, আবেগ, উল্লাস, ঐক্য ও একাত্মতা’।

তবে নিউজার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর স্পেনের খেলোয়াড়দের ওপর চড়াও হওয়া আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড় ও স্টাফদের আচরণের তদন্ত করছে ফিফা। এছাড়া, আমেরিকান সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আইশোস্পিডের প্রতি বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগেরও তদন্ত চলছে। অন্যদিকে, আটলান্টায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালসহ বেশ কয়েকটি ম্যাচ ঘুরে উগ্র আচরণের দায়ে সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

টুর্নামেন্টে রেফারিংয়ের মান নিয়ে হওয়া সমালোচনার ব্যাপারেও মন্তব্য করেছেন ইনফান্তিনো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছিল ফিফা। ফলে শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পান তিনি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে সিদ্ধান্ত পাল্টে যাওয়ার এমন নজির বিশ্ব ফুটবলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তবে ইনফান্তিনো যুক্তি দিয়েছেন যে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। তার দাবি, বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানীয় কিছু লিগে একই ধরনের রায় ‘নিয়মিত ব্যাপার ও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য’।

তিনি যোগ করেছেন, ‘এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, যেসব দেশ এই প্রথাগুলোর চর্চা করে, তারাই আবার সমালোচনা করছে।’

বিরোধীদের প্রতি ইনফান্তিনোর পরামর্শ, এমন একটি টুর্নামেন্টের প্রতি ‘কিছুটা ভালোবাসা’ ও ‘সম্মান প্রদর্শন করা’, যেখানে ‘মানুষ পরিবার হিসেবে, ভক্ত হিসেবে, এক হয়ে মিলেছে’।

নিজের ভূমিকা নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তিনি, ‘ফিফা সভাপতি হিসেবে এই আয়োজনে সামান্যতম হলেও অবদান রাখতে পেরে আমি অবিশ্বাস্যরকম গর্বিত। এটি দারুণ একটি অনুভূতি।’