কে হচ্ছেন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব, কে এগিয়ে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দায়িত্বের মেয়াদ শেষের পথে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর এই পদ থেকে বিদায় নেবেন পর্তুগালের নাগরিক গুতেরেস। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিনে বিশ্ব সংস্থাটির দায়িত্ব নেবেন নতুন মহাসচিব।

প্রথাগতভাবে জাতিসংঘের মহাসচিব পাঁচ বছর করে দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছর এই পদে থাকতে পারেন।

ইতোমধ্যে গুতেরেসের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

ট্রাম্পের ‘বিস্ময়কর’ প্রস্তাব

সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে জাতিসংঘের শীর্ষ পদে দেখতে চান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকেই এই ভাবনা।

প্রতীকী ছবি: এআই
প্রতীকী ছবি: এআই

সম্প্রতি সফলভাবে শেষ হয়েছে চলতি বছরের ফিফা বিশ্বকাপ। এই সাফল্যের জন্য ইনফান্তিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তার মতে, বিশ্ববাসীকে এক কাতারে নিয়ে আসার বিশেষ ক্ষমতা আছে ইনফান্তিনোর।

এ বিষয়ে ফিফা ও হোয়াইট হাউসের মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি অপর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ।

মহাসচিব নির্বাচনের বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় ইনফান্তিনোর নাম এলেও জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

আদতে ওই পদের জন্য ইনফান্তিনোকে বিবেচনা করা হবে কী না, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্ব সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুমোদন মিললে তারপর বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে।

অপরদিকে, অন্য যেকোনো বিষয়ের মতো মহাসচিব পদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
মহাসচিব পদের প্রার্থী কারা

ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের স্থলাভিষিক্ত হতে ছয়জন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট, ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা, আর্জেন্টিনার কূটনীতিক ও বিশ্ব পরমাণু সংস্থার বর্তমান মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অর্থনীতিবিদ রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট এবং সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল।

•    মিশেল ব্যাশেলেট (চিলি)

জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট দুই মেয়াদে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির প্রেসিডেন্ট ও দায়িত্ব পালন করেছেন।

Becoming: Michelle Bachelet
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট। ছবি: রয়টার্স

তিনি এবারের সবচেয়ে পরিচিত প্রার্থীদের একজন। নারীর অধিকার, মানবাধিকার ও সংকট প্রতিরোধে জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন এই কূটনীতিক।

গর্ভপাতের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রিপাবলিকান নেতার সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

চিলির ক্ষমতাসীন সরকার তার প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন তুলে নিলেও ব্রাজিল ও মেক্সিকো এখনো তাকে সমর্থন দিচ্ছে।

•    মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা (ইকুয়েডর)

ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা ২০১৮-১৯ মেয়াদে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন।

Ms María Fernanda Espinosa, new President of the General Assembly of the  United Nations - Global Interparliamentary Network | BindingTreaty.org
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা

তিনি মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয়, কার্যকর ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দিতে হবে। বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার ও সংস্থাটির কার্যকারিতা বাড়ানো তার প্রচারের মূল বিষয়।

•    রাফায়েল গ্রোসি (আর্জেন্টিনা)

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

ইরান ও ইউক্রেনসহ নানান আন্তর্জাতিক সংকটে তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

IAEA: Rafael Mariano Grossi to Assume Office as Director General on 3  December | International Atomic Energy Agency
আর্জেন্টিনার কূটনীতিক ও বিশ্ব পরমাণু সংস্থার বর্তমান মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি

তিনি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী করতে সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।

•    রেবেকা গ্রিনস্প্যান (কোস্টারিকা)
Address by the Secretary-General of the United Nations Conference on Trade  and Development Rebecca Greenspan to the participants of the IV Eurasian  Women's Forum
অর্থনীতিবিদ রেবেকা গ্রিনস্প্যান

অর্থনীতিবিদ রেবেকা গ্রিনস্প্যান বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) মহাসচিব। তিনি এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। লিঙ্গসমতা, টেকসই উন্নয়ন ও জাতিসংঘের সংস্কারকে তিনি তার প্রচারের মূল অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

•    ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট (গায়ানা)

গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট বর্তমানে জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি।

Statement delivered by Her Excellency Carolyn Rodrigues-Birkett, Permanent  Representative of Guyana to the United Nations, at the United Nations  Security Council "Briefing by the United Nations High Commissioner for  Refugees”
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট

দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে কাজ করেছেন। তিনি তুলনামূলকভাবে দেরিতে প্রার্থী হলেও কূটনৈতিক মহলে তার উল্লেখযোগ্য সমর্থক রয়েছে।

•    ম্যাকি সাল (সেনেগাল)

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে নিজের প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়ন দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাল-এর ভাই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত |  আন্তর্জাতিক | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল

আফ্রিকার প্রার্থী হলেও লাতিন আমেরিকার পালা এসেছে—এমন যুক্তির মধ্যেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রার্থীদের উন্মুক্ত সংলাপ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার এই সম্ভাব্য প্রার্থীরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অ্যাসেম্বলি হলে একটি উন্মুক্ত সংলাপে অংশ নেবেন।

বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোররাত ৩টায় ওই সংলাপ শুরু হবে। প্রত্যেক সম্ভাব্য প্রার্থী ৯০ মিনিট ধরে কূটনীতিবিদ, জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আসা প্রশ্নের জবাব দেবেন।

প্রতীকী ছবি: এআই
প্রতীকী ছবি: এআই

অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।

এর এক সপ্তাহ পর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আগামী ৩০ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্র রুদ্ধদ্বার ভোটে অংশ নিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবে।

যতক্ষণ না একজন প্রার্থী অন্তত নয়টি ভোট পান এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটোর মুখে না পড়েন, ততক্ষণ ভোট চলতে থাকবে।

এরপর নির্বাচিত প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিক নিয়োগের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে।

২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি নতুন মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

কে এগিয়ে

বিশ্লেষকদের মতে, স্পষ্ট ব্যবধানে না হলেও মহাসচিবের দৌড়ে অন্যদের তুলনায় খানিকটা এগিয়ে আছেন রাফায়েল গ্রোসি। তবে গ্রিনস্প্যান বা বার্কেটও এই সম্মানজনক পদ অর্জন করতে পারেন।

রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ছবি: রয়টার্স
রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ছবি: রয়টার্স

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘবিষয়ক পরিচালক রিচার্ড গোয়ান বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণে এখনো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে রাফায়েল গ্রোসির নাম। তবে তিনি এখনো দৌড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেস-বার্কেটের মতো অন্য প্রার্থীদেরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থক রয়েছেন।’ 

ট্রাম্পের পছন্দ ইনফান্তিনো। ছবি: রয়টার্স

একই সঙ্গে তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তে কোনো ‘ডার্ক হর্স’ (অপ্রত্যাশিত) প্রার্থীও আবির্ভূত হতে পারেন।

বিভিন্ন মহল থেকে এবার প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাসচিব নিয়োগের দাবি উঠেছে।

তবে, ইনফান্তিনোর নাম নিয়ে আলোচনা থাকলেও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নন। ট্রাম্পের সমর্থনের কারণে তার নাম আলোচনায় এলেও তাকে মহাসচিব পদে বিবেচনা করা হবে কী না, তা এখনো স্পষ্ট নয়র