বিশ্বকাপের যত পেনাল্টি মিস, মেসিসহ কে কে তালিকায়

রবিউল কমল
রবিউল কমল

বিশ্বকাপের মঞ্চে পেনাল্টি পাওয়া মানে গোল করার দারুণ সুযোগ। কিন্তু কখনো কখনো অনেক তারকা খেলোয়াড় সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন না। তারা কখনো গোলবারের পাশ দিয়ে, আবার কখনো উড়িয়ে বল মারেন, কিংবা গোল রক্ষক নিজেই আটকে দেন। এই পেনাল্টি মিসের ঘটনা হয়ে ওঠে একটি দেশের কান্না, একটি প্রজন্মের আফসোস এবং একজন ফুটবলারের আজীবনের দুঃস্বপ্ন।

ফুটবল ইতিহাসের এমন অসংখ্য মুহূর্ত সমর্থকরা দীর্ঘদিন মনে রাখেন। তবে কেউ সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে কিংবদন্তি হয়েছেন, কেউ আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন আক্ষেপের ভার। আবার কোথাও কোথাও একটি ভুল শটের পর জন্ম নিয়েছে জনরোষ, হুমকি, এমনকি ঘটেছে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত পেনাল্টি মিসের ঘটনা নিয়ে এই আয়োজন।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায় ইতালির বাজ্জিওর শর্ট। হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। ছবি: এএফপি
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায় ইতালির বাজ্জিওর শর্ট। হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। ছবি: এএফপি

রবার্তো বাজ্জিও (ইতালি, ১৯৯৪)

ফুটবল ইতিহাসে পেনাল্টি মিসের কথা উঠলে সবার আগে যার বিষণ্ণ মুখটি ভেসে ওঠে, তিনি ইতালির মহানায়ক রবার্তো বাজ্জিও। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল ও ইতালি যখন টাইব্রেকারে মুখোমুখি, তখন পুরো টুর্নামেন্টে ইতালিকে টেনে তোলা বাজ্জিওর ওপর ছিল সব ভরসা। কিন্তু তার নেওয়া শটটি ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায় আকাশে।
ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা যখন উল্লাসে মাতোয়ারা, বাজ্জিও তখন মাথা নিচু করে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্তব্ধ হয়ে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি জিকোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন কিন্তু ফরাসি গোলরক্ষক জোয়েল ব্যাটস। ছবি: সংগৃহীত
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি জিকোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন কিন্তু ফরাসি গোলরক্ষক জোয়েল ব্যাটস। ছবি: সংগৃহীত


জিকো (ব্রাজিল, ১৯৮৬)

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর জিকোকে বলা হয় ‘বিশ্বকাপ না জেতা সেরা খেলোয়াড়’। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ ম্যাচ। দ্বিতীয়ার্ধে বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন ইনজুরি কাটিয়ে ওঠা জিকো। মাঠে নেমেই দলকে একটি পেনাল্টি এনে দেন তিনি। নিজেই শট নিতে যান, কিন্তু ফরাসি গোলরক্ষক জোয়েল ব্যাটস সহজেই তা আটকে দেন। ম্যাচটি পরে টাইব্রেকারে গড়ায় এবং জিকো সেখানে গোল করলেও ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত বিদায় নেয়। ওই একটি পেনাল্টি মিস না হলে হয়তো জিকোর ক্যারিয়ারের গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।

Argentina captain Diego Maradona reacts after his penalty is saved by Yugoslavia goalkeeper Tomislav Ivkovic at the 1990 World Cup.
১৯৯০ বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ম্যারাডোনার নেওয়া পেনাল্টি শটটি গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেওয়ার পর ম্যারাডোনার প্রতিক্রিয়া। ছবি: সংগৃহীত

দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা, ১৯৯০)

১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অভিযান খুব একটা সহজ ছিল না। শিরোপাধারী দলটি গ্রুপ পর্বেই ক্যামেরুনের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যায়। এরপর ব্রাজিলের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক কৌশলে জয় এবং একের পর এক নাটকীয় ম্যাচ পেরিয়ে তারা পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে।

কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা দলের প্রথম দিকের শট নিতে এসে সবাইকে বিস্মিত করেন। তার নেওয়া দুর্বল শটটি সহজেই আটকে দেন যুগোস্লাভ গোলরক্ষক। তবে সেই ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

২০০৬ বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করেন জেরার্ড। ছবি: সংগৃহীত
২০০৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জেরার্ডের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন পর্তুগিজ গোলকিপার। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ও স্টিভেন জেরার্ড (ইংল্যান্ড, ২০০৬)

২০০৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলটিকে বলা হচ্ছিল তাদের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’। মধ্যমাঠে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ও স্টিভেন জেরার্ডের মতো দুই বিশ্বসেরা মিডফিল্ডার। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে গিয়েই সব খেই হারিয়ে ফেলল ইংলিশরা। পর্তুগিজ গোলরক্ষক রিকার্দোর অতিমানবীয় ফর্মের সামনে ল্যাম্পার্ড ও জেরার্ড দুজনই পেনাল্টি মিস করেন। ইংল্যান্ডের চারটির মধ্যে তিনটি পেনাল্টিই ভেস্তে যায়, আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় তাদের সেরা প্রজন্মটি।

The Brain of view: Italy are the world champions 2006
২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের হয়ে একমাত্র পেনাল্টিটি মিস করেন ত্রেজেগে। ছবি: সংগৃহীত

ডেভিড ত্রেজেগে (ফ্রান্স, ২০০৬)

২০০০ সালের ইউরো ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে গোল্ডেন গোল দিয়ে ফ্রান্সকে জেতানো ত্রেজেগে ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে বনে গেলেন ট্র্যাজিক হিরো। জিদানের সেই বিখ্যাত ‘হেডবাট’ কাণ্ডের পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ফ্রান্সের হয়ে একমাত্র পেনাল্টিটি মিস করেন ত্রেজেগে; তার শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ইতালি সবকটি শটে গোল করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।

England's Harry Kane takes his second penalty during the FIFA World Cup 2022 quarterfinal match between England and France at Al Bayt Stadium, Al Khor, Qatar, Dec. 10, 2022. (EPA Photo)
২০২২ সালে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে হ্যারি কেইন দ্বিতীয় পেনাল্টি শট নেন। শটটি তিনি মিস করেন, বারের ওপর দিয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড, ২০২২)

কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের মুখোমুখি ইংল্যান্ড। ম্যাচ তখন ২-১ ব্যবধানে ফ্রান্সের পক্ষে। এমন সময় ইংল্যান্ড আরেকটি পেনাল্টি পায়। সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ কাপ্তান হ্যারি কেইনের সামনে। এর আগের পেনাল্টিতেই ফ্রান্সের গোলরক্ষক এবং টটেনহ্যামে তার দীর্ঘদিনের সতীর্থ হুগো লরিসকে পরাস্ত করেছিলেন কেইন। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন মুখোমুখি হলেন, চেনা সতীর্থের মনস্তাত্ত্বিক চাপের কাছেই যেন হেরে গেলেন কেইন। বল উড়িয়ে মারলেন বারের ওপর দিয়ে। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ওখানেই থমকে যায়।

Messi misses penalty in first bid for World Cup scoring record
২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করেন মেসি। ছবি: সংগৃহীত

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা, ২০১৮-২০২২-২০২৬)

২০১৮ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে  আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির নেওয়া শটটি আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক হ্যালডরসন আটকে দেন। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়, যা আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। ২০২২ বিশ্বকাপেও পোল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে পেনাল্টি মিস করেছিলেন তিনি। সর্বশেষ গতকাল ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও পেনাল্টি মিস করেছেন মেসি। তবে ২-০ গোলে ম্যাস জিতেছে আর্জেন্টিনা, দুটি গোলই মেসি করেছেন।

FIFA World Cup - Cristiano Ronaldo
২০১৮ বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেন রোনালদো। ছবি: সংগৃহীত

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল, ২০১৮)

২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ও মরক্কোর সঙ্গে জয়সূচক গোল দিয়ে উড়ছিলেন সিআরসেভেন। কিন্তু গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করে বসেন তিনি। তার শটটি রুখে দেন ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয় এবং পর্তুগাল গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে নকআউটে গিয়ে উরুগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেয়।

Ghana's Asamoah Gyan (right) holds his head after missing a penalty against Uruguay at the 2010 World Cup.
২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার আসামোয়া গিয়ানের পেনাল্টি লাগে ক্রসবারে। ছবি: সংগৃহীত

আসামোয়া গিয়ান (ঘানা, ২০১০)

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং নিষ্ঠুর পেনাল্টি মিসের ঘটনা এটি। ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে গোললাইনে হাত দিয়ে নিশ্চিত গোল ঠেকান। সুয়ারেজ লাল কার্ড পান এবং ঘানা পেনাল্টি পায়। এই পেনাল্টিতে গোল করতে পারলেই ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখত ঘানা। পুরো ঘানা তথা আফ্রিকার কোটি মানুষের স্বপ্ন নিয়ে শট নিলেন আসামোয়া গিয়ান। কিন্তু বল লেগে গেল ক্রসবারে! গিয়ান মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর টাইব্রেকারে ঘানা হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।

ক্রিস ওয়াডল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে মিস করেছিলেন। সেই মিস ইংল্যান্ডকে ফাইনালে ওঠা থেকে বঞ্চিত করে। ছবি: সংগৃহীত
ক্রিস ওয়াডল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে মিস করেছিলেন। সেই মিস ইংল্যান্ডকে ফাইনালে ওঠা থেকে বঞ্চিত করে। ছবি: সংগৃহীত

ক্রিস ওয়াডল ও স্টুয়ার্ট পিয়ার্স (ইংল্যান্ড, ১৯৯০)

পেনাল্টি শুট-আউটের নাম শুনলেই ইংলিশ সমর্থকদের বুক যে কেঁপে ওঠে, তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের শট জার্মান গোলরক্ষকের পায়ে লেগে প্রতিহত হওয়ার পর, ম্যাচ টিকিয়ে রাখার সব চাপ এসে পড়ে ক্রিস ওয়াডলের কাঁধে। কিন্তু ওয়াডল বলটি মারলেন বারের অনেক ওপর দিয়ে আকাশ অভিমুখে।

France player Michel Platini holds his head aftre his miss in the penalty shoot-out.
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে বারের ওপর দিয়ে পেনাল্টি মারেন মিশেল প্লাতিনি। ছবি: সংগৃহীত

মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স, ১৯৮৬)

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল বনাম ফ্রান্সের ম্যাচটি ছিল এক ক্লাসিক লড়াই। ফ্রান্সের প্রাণভোমরা এবং তিনবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মিশেল প্লাতিনি ম্যাচের নির্ধারিত সময়ে গোল করেছিলেন। কিন্তু নিজের ৩১তম জন্মদিনে টাইব্রেকারে শট নিতে গিয়ে তিনি বল মারলেন বারের ওপর দিয়ে। অবশ্য প্লাতিনির ভাগ্য ভালো ছিল, কারণ তার এই ভুলের পরও ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত সেই শুট-আউট জিতে সেমিফাইনালে কোয়ালিফাই করেছিল।

Aurelien Tchouameni fails to hit the target with his penalty as France are beaten by Argentina in a shootout in the 2022 World Cup final.
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের চুয়ামেনি গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে বল মারেন। ছবি: সংগৃহীত

অরেলিয়েন চুয়ামেনি ও কিংসলে কোমান (ফ্রান্স, ২০২২)

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালটি ছিল শতাব্দীর অন্যতম সেরা ম্যাচ। টাইব্রেকারে কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করলেও তার সতীর্থরা আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের মনস্তাত্ত্বিক চাপের কাছে ভেঙে পড়েন। কিংসলে কোমানের শট মার্টিনেজ ঠেকিয়ে দেওয়ার পর চুয়ামেনির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। শট নেওয়ার ঠিক আগে মার্টিনেজ বলটি দূরে ছুড়ে দিয়ে চুয়ামেনির মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করেন। সেই চাল কাজও করেছিল, চুয়ামেনি গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে বল মারেন এবং ফ্রান্সের টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন ভেঙে যায়।

Rodrygo is consoled by Real Madrid team-mate Luka Modric after his penalty miss in Brazil's World Cup semi-final loss to Croatia at Qatar 2022.
কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের রদ্রিগোর পেনাল্টি আটকে দেন ক্রোয়েশিয়ার গোলকিপার। ছবি: সংগৃহীত

রদ্রিগো (ব্রাজিল, ২০২২)

কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল হট-ফেভারিট ব্রাজিল। অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের জাদুকরী গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে গোল শোধ করে দেয় ক্রোয়েশিয়া। টাইব্রেকারে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম শটটি নিতে আসেন তরুণ তারকা রদ্রিগো। কিন্তু তার দুর্বল শটটি ক্রোয়াট প্রাচীর ডমিনিক লিভাকোভিচ সহজেই আটকে দেন। পরে মার্কিনহোসের শট পোস্টে লাগলে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় হেক্সা মিশনের খোঁজে আসা ব্রাজিল।

Sergio Busquets sees his penalty saved by Yassine Bounou as Spain lose to Morocco in a shootout in the last 16 of the 2022 World Cup.
২০২২ বিশ্বকাপে স্পেনের সার্জিও বুসকেটসের পেনাল্টি রুখে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন। ছবি: সংগৃহীত

সার্জিও বুসকেটস (স্পেন, ২০২২)

২০২২ বিশ্বকাপে তারুণ্যনির্ভর স্পেন দল চমৎকার ফুটবল খেললেও গোল করার লোক খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষ ষোলোর ম্যাচে মরক্কোর সাথে ১২০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে রূপ নেয়। সেখানে স্পেনের পেনাল্টি নেওয়ার পারফরম্যান্স ছিল এককথায় বিপর্যয়কর। প্রথম দুটি শট মিস করার পর অভিজ্ঞ অধিনায়ক সার্জিও বুসকেটস এসেছিলেন দলের আশা বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু তার শটও মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো রুখে দিলে স্পেন একটি গোলও না করতে পারার লজ্জা নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।

Italy's Franco Baresi is consoled by Brazil goalkeeper Taffarel after his penalty miss in the shootout in the 1994 World Cup final.
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ফাইনালের পেনাল্টি মিস করেন ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রাঙ্কো বারেসি (ইতালি, ১৯৯৪)

১৯৯৪ ফাইনালের টাইব্রেকারে রবার্তো বাজ্জিওর মিসটি যতটা বিখ্যাত, ঠিক ততটাই আড়ালে পড়ে গেছে অধিনায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসির মিসটি। পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে একাই বোতলবন্দি করে রাখা এই কিংবদন্তি ডিফেন্ডার টাইব্রেকারের একদম প্রথম শটটি নিতে এসেছিলেন। কিন্তু বাজ্জিওর মতোই তিনি বল মারলেন বারের ওপর দিয়ে আকাশে।

২০২২ বিশ্বকাপে পোলান্ডের রবার্ট লেভানডোস্কির পেনাল্টি রুখে দেন মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ওচোয়া। ছবি: এএফপি
২০২২ বিশ্বকাপে পোলান্ডের রবার্ট লেভানডোস্কির পেনাল্টি রুখে দেন মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ওচোয়া। ছবি: এএফপি

রবার্ট লেভানডোস্কি (পোল্যান্ড, ২০২২)

পোল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডোস্কি ২০২২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে দলকে জেতানোর এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পেনাল্টি থেকে নেওয়া তার শটটি মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন। ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হলেও পোল্যান্ড অবশ্য পরে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে পেরেছিল।

আত্মঘাতী গোল ও আন্দ্রেস এসকোবারের গুলিতে মৃত্যু

১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া ছিল অন্যতম ফেবারিট দল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি আত্মঘাতী গোল করেন। ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় কলম্বিয়া।

বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মেদিইনে গুলিতে নিহত হন এসকোবার। তদন্তে একজন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও, অনেকের ধারণা বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ব্যর্থতা, আত্মঘাতী গোল এবং সে সময়ের অবৈধ জুয়া ও অপরাধচক্রের প্রভাব এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

ফুটবল ঘিরে বিক্ষোভ, সহিংসতা ও জনরোষ

বিশ্বকাপে একটি পেনাল্টি মিস কখনো কখনো শুধু একটি ম্যাচের ফল বদলে দেয় না, পুরো একটি দেশের আবেগকেও নাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসে এমন কয়েকটি ঘটনা রয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস বা বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে জনরোষ, বিক্ষোভ, হুমকি এমনকি সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।

Andrés Escobar: The Tragic Story of Football's Gentleman
১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার আত্মঘাতী গোল করেন। বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মেদিইনে গুলিতে নিহত হন তিনি। ছবি: সংগৃহীত

কলম্বিয়া (১৯৯৪)

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল কলম্বিয়ায়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে আন্দ্রেস এসকোবারের আত্মঘাতী গোলের পর কলম্বিয়া টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। দেশে ফেরার মাত্র কয়েকদিন পর মেদিইনে গুলিতে নিহত হন এই ডিফেন্ডার।

যদিও হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধচক্র, জুয়া ও ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়ও জড়িত ছিল, তবুও বিশ্বজুড়ে ঘটনাটি বিশ্বকাপের সেই আত্মঘাতী গোলের সঙ্গেই বেশি পরিচিত। ফুটবল মাঠের একটি ভুলের জন্য একজন খেলোয়াড়ের প্রাণ হারানোর এই ঘটনা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঘানা (২০১০)

২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পান আসামোয়া গিয়ান। গোলটি হলে ঘানা হতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান দল। কিন্তু গিয়ানের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। পরে টাইব্রেকারে উরুগুয়ে জয় পায়।

ঘানাজুড়ে ব্যাপক হতাশা ছড়িয়ে পড়লেও সহিংস বিক্ষোভ বা বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেনি। বরং অনেক সমর্থক গিয়ানের পাশে দাঁড়ান। পরে তিনি জাতীয় দলের অধিনায়কও হন। তবে আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে এটি এখনও সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলোর একটি।

ইংল্যান্ড (১৯৯০, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০২১)

পেনাল্টি ট্র্যাজেডির সঙ্গে ইংল্যান্ডের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ১৯৯০ বিশ্বকাপে স্টুয়ার্ট পিয়ার্স ও ক্রিস ওয়াডলের মিস, ১৯৯৬ ইউরোতে গ্যারেথ সাউথগেটের ব্যর্থতা এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপের হতাশা ইংলিশ ফুটবলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
অনেক খেলোয়াড় বছরের পর বছর সমালোচনা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং সংবাদমাধ্যমের কঠোর আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাদের বাড়ির সামনে প্রতিবাদ, কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে। তাদের নিয়ে অপমানজনক শিরোনাম করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ইউরো ২০২০ ফাইনালের পর। ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করা বুকায়ো সাকা, মার্কাস র‍্যাশফোর্ড ও জেডন সানচো সামাজিকমাধ্যমে বর্ণবাদ ও ঘৃণার শিকার হন। ঘটনাটি শুধু ইংল্যান্ড নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়।

আর্জেন্টিনা (২০১৬ কোপা আমেরিকা)

যদিও এটি বিশ্বকাপ নয়, তবে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পেনাল্টি মিসের পর জনরোষের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেন লিওনেল মেসি। ম্যাচ শেষে হতাশ মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।

আর্জেন্টিনাজুড়ে তখন ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা এবং আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পরে জনমত ও সমর্থকদের অনুরোধে তিনি সিদ্ধান্ত বদলান এবং জাতীয় দলে ফিরে আসেন।