জায়ার থেকে কঙ্গো

রাত শেষ হয়, ভোর আসে

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘুমিয়ে ছিল একটি স্বপ্ন। মধ্য আফ্রিকার সেই ভূখণ্ডে, যেখানে কঙ্গো নদী ছুটে যায় সমুদ্রের দিকে, আর ফুটবলের একটি ক্ষত পচে যাচ্ছিল চুপচাপ। মানুষ ভুলতে পারেনি। মুছে ফেলতে পারেনি। ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানিতে যা ঘটেছিল, তা ছিল একটি জাতির অপমান, একটি একনায়কের ছায়ায় ডুবে যাওয়া মানুষদের নিঃশব্দ কান্না। এবার সেই ঘুম ভাঙল হিউস্টনে।

দেশটির নাম তখন জায়ার। একনায়ক মোবুতু সেসে সেকোর শাসনে চলা এক রাষ্ট্র। মোবুতু ফুটবলে বিনিয়োগ করেছিলেন ভীষণভাবে। ১৯৬৮ এবং ১৯৭৪ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স জিতে নেওয়া সেই দলকে বিশ্বকাপে পাঠানোর আগে তিনি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে গাড়ি ও বাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। মহাদেশের সেরা দল। সত্যিকারের সিংহেরা। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির মাঠে পৌঁছানোর আগেই শুরু হলো বিশ্বাসঘাতকতা।

ফিফার বোনাসের অর্থ আত্মসাৎ করে নিলেন সরকারের প্রতিনিধিরা। খেলোয়াড়রা জানলেন, তাদের প্রাপ্য মজুরি কখনোই পাবেন না। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ০-২ হার মানা গেলেও যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে যা হলো, তা ফুটবলের মাঠে ঘটা একটি নাটকের চেয়ে বরং ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ। মোবুতুর প্রতিনিধিরা জানালেন, প্রথম হারের পর আর বেতন দেওয়া হবে না। খেলোয়াড়রা ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নামলেন কার্যত ধর্মঘটের মানসিকতায়। ফল হলো ৯-০।

এরপর এলো সেই ভয়াবহ হুমকি। স্বয়ং মোবুতু তখন ব্যক্তিগতভাবে উড়ে এলেন পশ্চিম জার্মানিতে। ব্রাজিলের বিপক্ষে চার গোলের বেশি হারলে তারা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারবেন কিনা, সেই নিশ্চয়তাও দিলেন না। এই আতঙ্কের মধ্যেই ঘটল সেই বিখ্যাত দৃশ্য। ব্রাজিলের ফ্রি-কিকের আগেই ডিফেন্ডার এমওয়েপু ইলুঙ্গা দৌড়ে গিয়ে বল লাথি মারলেন দূরে। হাসল পৃথিবী, ভেবেছিল এটি অজ্ঞতা। কিন্তু ইলুঙ্গা পরে জানিয়েছিলেন, তিনি রেফারির কাছ থেকে লাল কার্ড চাইছিলেন, মাঠ থেকে পালানোর একটি পথ খুঁজছিলেন জীবন বাঁচাতে।

সেই বিশ্বকাপ শেষে শূন্য হাতে ফিরলেন তারা। ফুটবল থেকে মুখ ফেরালেন মোবুতু। জাতীয় দলে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কেউ ক্যারিয়ার হারালেন। আর কেউ তো পরে গৃহহীন হয়ে পড়লেন। সেই থেকে পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। বিশ্বকাপের মাঠে ফেরার চেষ্টা করেছে বারবার, ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিটি ব্যর্থ আফ্রিকা কাপ, প্রতিটি মিস হওয়া বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সঙ্গে সেই প্রথম ভুল ধারণাটি আরও শক্ত হয়ে বসছিল, জায়ার নামের ভূতটি পিছু ছাড়ছিল না।

কঙ্গোর একটি পুরনো প্রবাদ আছে লিঙ্গালা ভাষায়, রাত যতই দীর্ঘ হোক, ভোর আসবেই। পঞ্চাশ বছর ধরে সেই ভোরের অপেক্ষায় ছিল একটি দেশ। তারপর এলো ২০২৬।

ইন্টার-কনফেডারেশন প্লেঅফে জামাইকাকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে ডিআর কঙ্গো বিশ্বকাপের টিকিট পেল। পরের দিন দেশ জুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো। কিনশাসার রাস্তায় মানুষ নামল। হাসিতে মিশে গেল পঞ্চাশ বছরের কান্না।

হিউস্টন, ১৭ জুন ২০২৬।

এনআরজি স্টেডিয়ামে ৬৮ হাজার দর্শক। বেশিরভাগই পর্তুগালের লাল জার্সিতে। ছোট ছোট কিছু নীল দ্বীপ, ডিআর কঙ্গোর সমর্থকেরা। তারা জানেন তারা সংখ্যালঘু। কিন্তু তারা জানেন, ইতিহাস শুধু সংখ্যার হিসাবে লেখা হয় না। মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে পর্তুগাল এগিয়ে গেল। স্টেডিয়াম গর্জে উঠল। রোনালদো মাঠে, রেকর্ড বয়সে বিশ্বকাপে নামা এক কিংবদন্তি। মনে হচ্ছিল, এটা হবে এক প্রত্যাশিত ফলাফলের সন্ধ্যা।

কিন্তু ফুটবল গল্প শোনাতে ভালোবাসে।

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার মুহূর্তে, যখন ঘড়িতে যোগ করা সময় চলছে, আর্থার মাসুয়াকু বাঁদিক থেকে ভাসিয়ে দিলেন একটি ক্রস। ইয়োয়ান উইসা সেই বলে মাথা রাখলেন, পর্তুগালের জাল কাঁপল। বিস্ফোরিত হলো কঙ্গোর সমর্থকদের ছোট দলটি। এটি ছিল ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোল। ৫২ বছরে মোট ৩২টি প্রচেষ্টার পর।

ম্যাচ শেষে ১-১। ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট। কিন্তু সংখ্যাটি বলতে পারে না সবটুকু। কিনশাসায় সেই রাতে যারা টেলিভিশনের সামনে বসেছিলেন, তাদের অনেকের মনে হয়তো এসেছিল সেই মৃত খেলোয়াড়দের কথা, যারা ১৯৭৪-এ ভয়ের মধ্যে খেলেছিলেন, পাওনা মজুরি না পেয়ে ফিরেছিলেন। ২০১২ সালে একটি দাতব্য সংস্থা সেই বেঁচে থাকা খেলোয়াড়দের জন্য সামান্য মাসিক পেনশনের ব্যবস্থা করেছিল। তবে আসল কাজটি করলেন তাদের উত্তরসূরিরা। প্রমাণ করলেন, ইতিহাস বদলায়। লজ্জা ঘুচে যায়।

লেওপার্দরা ফিরেছে। এবার তারা মুক্ত।