২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে এত বিতর্ক কেন?
মাঠে গড়ানোর আগেই একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়েছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে রাজনীতি, যুদ্ধ, ভিসানীতি, মানবাধিকার, টিকিটের মূল্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক চলছে।
সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী ইরানের সংঘাত চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এ টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে, আর ইরান এশিয়া অঞ্চল থেকে বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধের ছায়া
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় বিতর্ক চলছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিয়ে। ইরানের বিরুদ্ধে গত প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের কারণে ইরানের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিয়েও নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
ইরানি দলের অনেক কর্মকর্তা ভিসা পাননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে বেস ক্যাম্প স্থাপনের অনুমতিও পায়নি ইরান। ফলে বিশ্বকাপে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো দেশ হলে হয়তো বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন উঠত।
ফিফা কি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ
বিশ্বকাপের আগে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে—প্রথমবারের মতো ট্রাম্পকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। একইসঙ্গে ট্রাম্পের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনোর উপস্থিতি ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী, সংস্থাটির রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ড সেই অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
কিছু ফুটবল কর্মকর্তা ২০২৬ বিশ্বকাপকে ‘মাগা (এমএজিএ) বিশ্বকাপ’ বলেও অভিহিত করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই টুর্নামেন্ট রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
ভিসা ও অভিবাসন ইস্যু
বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু এবার আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতি ও অভিবাসন কড়াকড়ি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ইরান ও হাইতির সাধারণ সমর্থকদের ওপর কার্যত প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা প্রবেশ করতে পারলেও দর্শকদের জন্য সুযোগ সীমিত।
সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকদের জন্যও ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অতীতে এসব দেশের অনেক নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের পরও অবস্থান করায় পর্যটক ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এছাড়া, বিশ্বকাপ চলাকালে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই) স্টেডিয়ামের আশপাশে অভিযান চালাতে পারে—এমন এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ পরিস্থিতি বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মানবাধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্ন
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, নির্বিচার আটক ও জাতিগত বৈষম্যের ঝুঁকি থাকতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম।
একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ড দলের বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি বন্দুক হামলায় কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে সহ-আয়োজক দেশ মেক্সিকোতেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একদিন আগেই দেশটির রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে ঐতিহাসিক অ্যাজতেকা স্টেডিয়াম এলাকায় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে শত শত মানুষ।
আকাশছোঁয়া টিকিট মূল্য
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কোনটি—দর্শক মহলের কাছে এমন প্রশ্নের উত্তর একটাই, সেটা হলো টিকিটের দাম। ফিফা এবার ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর অর্থ হলো চাহিদা বাড়লে টিকিটের দামও বাড়বে।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাইনাল ম্যাচের প্রিমিয়াম টিকিটের মূল্য শুরুতে প্রায় ১১ হাজার ডলার পর্যন্ত ছিল। মে মাসের শেষ দিকে ফিফার ওয়েবসাইটে ফাইনালের সবচেয়ে কম দামের টিকিটের মূল্য ছিল ৮ হাজার ৬২৫ ডলার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় টিকিটের দাম এবার প্রায় তিন গুণ বেশি।
সম্ভাব্য গড় হিসাব করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো সমর্থক যদি গ্যালারিতে বসে নিজের দলের সব ম্যাচ দেখতে চান, তাহলে টিকিট, যাতায়াত ও আবাসনসহ মোট খরচ পড়বে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি বিশেষ টিকিট। দর্শক গ্যালারির সামনের সারিতে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছের আসনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকারও বেশি।
এছাড়া অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্রেতা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি বা স্টেডিয়ামের নির্দিষ্ট অংশের টিকিট কিনলেও পরে তুলনামূলক কম সুবিধাজনক আসন পেয়েছেন।
সমর্থক সংগঠন ও ভোক্তা অধিকার গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে ফিফার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, স্বচ্ছতার অভাব ও অন্যায্য বিক্রয় পদ্ধতির অভিযোগ তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ও নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরাও ফিফার টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন।
সমালোচকদের মতে, এতে বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
৪৮ দল নিয়ে যত প্রশ্ন
এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। এর আগে এই সংখ্যা ছিল ৩২। ফলে ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪।
এতে প্রতিযোগিতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দল ও ম্যাচ সংখ্যা বাড়ায় এখন শুধু গ্রুপের শীর্ষ দুই দল নয়, তৃতীয় স্থান অধিকারকারী দলগুলোরও নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের ধারণা, ছোট দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার জন্যই ফিফা এই সম্প্রসারণ করেছে।
পরিবেশগত প্রভাব
ফিফা পরিবেশ সুরক্ষার কথা বললেও ২০২৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিবেশবিধ্বংসী বিশ্বকাপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট থেকে ৯০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো তিন দেশের বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা আয়োজক শহর ও বিপুল সংখ্যক বিমানযাত্রা।
এছাড়া, নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাতায়াতের ভাড়া ও বিভিন্ন ভেন্যুর পার্কিং ফি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
ফুটবলের চেয়ে কি ব্যবসা বড়?
এবার বিশ্বকাপে আরও একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে। সেটি হলো—ফুটবলের চেয়ে ব্যবসাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশি আয়, বেশি ম্যাচ, বেশি দর্শক ও বেশি বাণিজ্যিক চুক্তির লক্ষ্যে ফিফা এমন একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, যেখানে ফুটবলের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, মানবাধিকার ও পরিবেশের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠের লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠের বাইরে বিতর্কের জন্যও আলোচিত হয়ে উঠেছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয় বরং আধুনিক ফুটবল ও বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সম্পর্কেরও প্রতিচ্ছবি।