বিশ্বকাপের ২৪ দিন বাকি

‘গিহনের কলঙ্ক’: যে ম্যাচ চিরতরে বদলে দেয় বিশ্বকাপের নিয়ম

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যা স্মরণীয় হয়ে থাকে দারুণ কোনো গোল, শ্বাসরুদ্ধকর কোনো প্রত্যাবর্তন কিংবা নিখাদ রোমাঞ্চের জন্য। আবার এমন কিছু ম্যাচও আছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয় নিছক কলঙ্কের কালিমায়।

১৯৮২ সালের ২৫ জুন স্পেনের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে যা ঘটেছিল, তা ফুটবল নামক ‘বিউটিফুল গেম’-এর গায়ে লেপ্টে দিয়েছিল এক গাঢ় দাগ। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার সেই ম্যাচটি ‘গিহনের কলঙ্ক’ (Disgrace of Gijon) নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। এটি ছিল দিনের আলোয় হাজারো দর্শকের সামনে ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’-কে গলা টিপে হত্যার এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। স্পষ্ট করে বললে, ম্যাচ পাতানোর এক ঘৃণ্য গল্প। ফলাফল হিসেবে খোদ ফিফাকে তাদের বিশ্বকাপের নিয়ম চিরতরে বদলে ফেলতে হয়।

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব। তখন নিয়মের ফাঁক-ফোকর ছিল বেশ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো এখনকার মতো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হতো না। তাই মাঠে নামার আগেই দলগুলো জানত, ঠিক কী কী সমীকরণ মেলালে পরের রাউন্ডে যাওয়া সম্ভব।

দুই নম্বর গ্রুপে আলজেরিয়া ততক্ষণে সব ম্যাচ খেলে ফেলেছে। আফ্রিকার দেশটির পয়েন্ট ছিল তিন ম্যাচ শেষে ৪ (তখন প্রতিটি জয়ের জন্য ২ পয়েন্ট দেওয়া হতো)। এমনকি বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে তারা পশ্চিম জার্মানির মতো পরাশক্তিকে ২-১ গোলে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল। এরপর অস্ট্রিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে গেলেও চিলির বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয় তুলে নেয় আলজেরিয়া।

গিহনে অনুষ্ঠিত পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি ছিল ওই গ্রুপের শেষ লড়াই। অস্ট্রিয়ানদের পয়েন্ট ছিল দুই ম্যাচে ৪, আর সমান ম্যাচে জার্মানদের অর্জন ছিল ২ পয়েন্ট। সমীকরণটা ছিল একদম পরিষ্কার। পশ্চিম জার্মানি যদি ১-০ বা ২-০ গোলে জেতে, তবে গোল ব্যবধানে আলজেরিয়াকে ছিটকে দিয়ে তারা ও অস্ট্রিয়া— দুই দলই চলে যাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে!

ম্যাচের ১১তম মিনিটে হর্স্ট রুবেশ গোল করে পশ্চিম জার্মানিকে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত খেলায় অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা আমেজ ছিল। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আসল নাটক। গোলের পর দুই দল যেন হঠাৎ করেই ফুটবল খেলা ভুলে গেল!

রেফারি ছিলেন স্কটল্যান্ডের বব ভ্যালেন্টাইন, বিশ্বকাপর মঞ্চে তার প্রথম ম্যাচ। ৪০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বাজে স্মৃতি তার মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। ২০২২ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'ম্যাচের ২০ মিনিট অতিক্রম করার পরই আমার ভেতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি শুরু হলো। আমি ভাবছিলাম, "এখানে তো কেউ কাউকে ট্যাকল করছে না!" তারপর এক খেলোয়াড় বল নিয়ে মাঝমাঠ পার হয়ে থেমে গেল, বলটা সোজা নিজের গোলরক্ষকের দিকে ব্যাক-পাস করল। প্রতিপক্ষের বক্সে বল না ফেলে সে পেছনে খেলল। ঠিক ওই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারলাম, এখানে বড় কোনো ঘাপলা আছে।'

ম্যাচের বাকি সময়টা ছিল স্রেফ বল দেওয়া-নেওয়ার এক বিরক্তিকর মহড়া। কেউ দৌড়াচ্ছে না, কোনো আক্রমণ নেই। ভ্যালেন্টাইনের ভাষায়, 'গোলটা হওয়ার পরই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এখানে কোনো লড়াই হবে না। টুকটাক একটি-দুটি ফাউল হচ্ছিল বটে, তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা নিজেদের মধ্যে কয়েকটা পাস খেলে বল ধরে রাখছিল। এরপর অন্য দল আবার কিছু সময়ের জন্য বল ধরে রাখছিল।'

১-০ ব্যবধানেই খেলা শেষ হয়। ভীষণ বিতর্কিত এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়ে আলজেরিয়াকে কাঁদিয়ে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া কাটে দ্বিতীয় পর্বের টিকিট। পশ্চিম জার্মানির কোচ ইয়ুপ ডারওয়াল এবং অস্ট্রিয়ার দুই ম্যানেজার জর্জ শ্মিট ও ফেলিক্স লাৎজকে যেন আগে থেকেই সব ছক কষে রেখেছিলেন।

এই জঘন্য নাটকের পেছনে তাদের দায়ই সবচেয়ে বেশি দেখেন রেফারি ভ্যালেন্টাইন, 'আপনাকে মানতেই হবে যে, এর জন্য কোচরাই দায়ী ছিলেন। তারা সাইডলাইনে ছিলেন এবং খেলোয়াড়দের "খেলা চালিয়ে যাও!" বলে তাগিদ দেওয়ার দায়িত্বটা তাদেরই ছিল, আমার নয়! কোনো খেলোয়াড়কেই বিন্দুমাত্র লজ্জিত দেখায়নি। তারা এটা করার জন্যই মাঠে নেমেছিল এবং তারা সেটাই করেছে। ব্যাপারটা ঠিক এমনই সোজা। এটা সবার কাছেই একেবারে পরিষ্কার ছিল।'

আট হাজার আলজেরিয়ান সমর্থকসহ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৪১ হাজার দর্শক এই প্রহসন মেনে নিতে পারেননি। প্রতিবাদস্বরূপ গ্যালারি থেকে ভেসে আসতে থাকে তীব্র শিস আর দুয়ো ধ্বনি। এমনকি রাগে-ক্ষোভে এক জার্মান সমর্থক নিজ দেশের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেন।

আলজেরিয়ান সমর্থকরা মাঠে গিয়েছিলেন তাদের দলের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপন করতে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন, চোখের সামনেই ষড়যন্ত্র চলছে। ক্ষুব্ধ হয়ে তারা গ্যালারির বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে ব্যাংকনোট উঁচিয়ে ধরে ম্যাচ পাতানোর তীব্র প্রতিবাদ জানান। অনেকে মাঠে ঢুকে পড়ার চেষ্টাও করেন।

টেলিভিশন ধারাভাষ্যকাররাও এমন লজ্জায় শামিল হতে চাননি। জার্মান ধারাভাষ্যকার ইবারহার্ড স্ট্যানিয়েক প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন। এক অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকার দর্শকদের টিভি বন্ধ করে দিতে বলেন এবং ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিট কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

ম্যাচ শেষে তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও জার্মান বা অস্ট্রিয়ানদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছিল না। বরং বর্ণবাদী ও উদ্ধত মন্তব্য করেন দল দুটির কেউ কেউ। অন্যদিকে, আলজেরিয়ার ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, ফলাফল বহাল থাকে। পশ্চিম জার্মানি সেবার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে ইতালির কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়, অস্ট্রিয়া বিদায় নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই।

গিহনে প্রতারণার শিকার হয়ে আলজেরিয়া সেদিন অশ্রুসিক্ত চোখে বাড়ি ফিরেছিল। তবে তাদের বিদায়ের ঘটনাটি বিশ্বকাপ ফুটবলকে চিরতরে বদলে দেয়। সমালোচনার তোড়ে শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাধ্য হয় নিয়ম পাল্টাতে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, পরবর্তী অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে প্রথম রাউন্ডের প্রতিটি গ্রুপের শেষ দুটি ম্যাচ সব সময় একই দিনে এবং ঠিক একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে, যাতে কেউ কোনো সমীকরণের অন্যায় সুযোগ নিতে না পারে।